বোমার সরঞ্জাম তৈরি হয়েছিল ভারতে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রকে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতারকৃতরা জানান যে, জে-এম-বি’র ব্যবহৃত বোমার সরঞ্জাম তৈরি হয়েছিল ভারতে। ভারতীয় নাগরিক নাসিরউদ্দীন ও গিয়াস উদ্দীনের স্বীকারোক্তিতে গোয়েন্দারা জানতে পারেন যে, বাংলাদেশের সিরিজ বোমা হামলায় পশ্চিম বাংলার উত্তর ২৪ পরগনার মাওলানা মহসিন ভাদুরিয়ার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সিরিজ বোমা হামলার পরে রাজশাহীর তানোর ও কিশোরগঞ্জে জে-এম-বি’র সদস্যদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত পাওয়ার জেল, এক্সপ্লোসিভ ও ইলেকট্রোনিক্স ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়। এসব উপকরণ ‘ইন্ডিয়া এক্সপ্লোসিভ লিমিটেড’-নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন। এর প্যাকেটের গায়ে ‘গোমিয়া’ লেখা থাকায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বোমার ঐ উপকরণসমূহ তৈরি হয়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের একটি সামরিক অস্ত্র তৈরির কারখানায়। সামরিক অস্ত্র কারখানা থেকে কীভাবে এসব ডিটোনেটর ও বোমা সামগ্রী জঙ্গিদের হাতে আসে, সে ব্যাপারে ভারত বাংলাদেশকে কোন তথ্য দেয়নি।

অথচ এসব তথ্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে সরবরাহ করা সত্ত্বেও ভারত এর বৃত্তান্ত উদঘাটন ও উৎস অনুসন্ধানে কোন তৎপরতা দেখায়নি। কিংবা এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে কোন তথ্যও দেয়নি। ভারতের দায়িত্বশীল মহল যদি এসব সামরিক উপকরণ পাচার বা জঙ্গিদের হাতে তুলে দেবার সাথে জড়িত না থাকেন, তাহলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে তাদের মাঝে উদ্বেগ ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবার কথা। বিশেষ করে, বাংলাদেশে জে-এম-বি’র সিরিজ বোমা হামলার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ভারত যেখানে ভারতই বাংলাদেশকে একটি জঙ্গিবাদী দেশ হিসেবে সরাসরি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত করে আসছে, সেখানে জঙ্গিরা ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতের বোমা উপকরণ ব্যবহার করে যে বোমা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল ও কলঙ্কিত করার চক্রান্ত চালিয়ে আসছে, ভারতের দায়িত্বশীল মহল তাকে উপেক্ষা করে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ায় ভারতের অবস্থান নিয়ে যৌক্তিক কারণেই রহস্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সন্নিহিত ভারতের পশ্চিম বাংলার কতিপয় এলাকায় জে-এম-বি’র বোমাবাজরা প্রশিক্ষণ পেয়েছে। বাংলাদেশ নিশ্চিত হয়েই এ তথ্য ভারতকে জানায়। বাংলাদেশের এই গুরুতর অভিযোগ ভারত তাহলে কেন আমলে নেয়নি?

এসব জঙ্গিবাদী ক্যাম্পে মুসলমান নামধারী ভারতীয় নাগরিকরাই প্রশিক্ষণ নিয়েছে। যাদের সমন¦য় করেছে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনীর লোকজন। পর্যবেক্ষক মহলের প্রশ্ন, ভারতের প্রশাসন, পুলিশ এবং গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে সেখানে কোন সংখ্যালঘু মুসলমান নাগরিকের পক্ষে জঙ্গিবাদের মতো অন্তর্ঘাতী তৎপরতা চালাতে পারে না। বিশেষ করে, এসব জঙ্গিবাদী তৎপরতা সমন¦য় করার দায়িত্ব পালন করেছেন ছদ্মবেশী ভারতীয় গোয়েন্দা ও সামরিককর্মকর্তারা। কিন্তু আজ পর্যন্ত এসব গুরুতর অভিযোগের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বাংলাদেশকে জানায়নি। এসব জঙ্গি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বন্ধ করা হয়েছে কিনা, এ ব্যাপারেও বাংলাদেশ সরকারকে নিশ্চিত করা হয়নি। জে-এম-বি’র শীর্ষ নেতা শায়াখ আবদুর রহমান শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী যুবলীগ নেতার বোনের জামাই। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার বোনের জামাই, বোন ও ভাগ্নেসহ গোটা পরিবারের জঙ্গি তৎপরতা সম্পর্কে ওই আওয়ামী-যুবলীগ নেতা অজ্ঞ ছিলেন বলে কেউ মনে করেন না।

বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী অপবাদে জড়িয়ে জাতীয়তাবাদী ইসলামী ধারার রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতার দৃষ্টপট থেকে সরিয়ে দিয়ে তার যায়গায় আওয়ামী লীগ ও তাদের বাম সেক্যুলার এবং রামপন্থীদের অধিষ্ঠিত করার একটা নীল নকশাকে সামনে রেখে যারা বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে জনযুদ্ধ, সর্বহারাদের গলাকাটা রাজনীতির নামে সন্ত্রাস ও আতংক তৈরি করেছিল, তারাই রাজশাহীর বাগমারা এলাকায়, ইসলামপন্থী নামধারী ‘বাংলাভাই’ ও তার শিষ্যদের সংগঠিত করে ‘জাগ্রত জনতার’ ব্যানারে পাল্টা সন্ত্রাস শুরু করে।

ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার নামে এদের সাথে বেশ কিছু সরলপ্রাণ ধর্মভীরু মানুষকেও তারা দলে ভিড়াতে সক্ষম হয়। প্রচলিত মূল ধারার ইসলামী দল ও ব্যক্তিদের পাশ কাটিয়ে এরা বোমা-সন্ত্রাস করে দেশে ইসলামী ‘হুকুমাত’ প্রতিষ্ঠার কথাও প্রচার করে। এদেরই সহযোগী ক্যাডাররা পরে জে-এম-বি’র ব্যানারে দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে জে-এম-বি নামের জঙ্গিরা সংগঠিত ও শক্তিশালী।
জে-এম-বি’র শীর্ষ নেতার মধ্যপ্রাচ্য থেকে অর্থ সংগ্রহে সহায়তাকারী হিসেবে বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ভারতপন্থী দেওবন্দী আলেমকেও তখন গোয়েন্দারা ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। কিন্তু ভারতীয় কংগ্রেস লবীর ‘খাস লোক’ হিসেবে ঐ শীর্ষ দেওবন্দী আলেমকে কারাগারে আটক রাখা বা তার কাছ থেকে কাক্সিক্ষত তথ্য আদায় করা সম্ভব হয়নি। ঐ দেওবন্দী আলেম বর্তমান আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকারের আমলে সরকারের নেক নজরে থাকায় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহে জামায়াতে ইমামতির দায়িত্ব পেয়েছেন।

এছাড়া সরকারের ভারতমুখী নীতির পক্ষে জনমত সংগঠনে ওই বাংলাদেশী দেওবন্দী আলেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এর বাইরেও আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আÍীয় এবং গোপালগঞ্জের এক ব্যক্তি জে-এম-বি ও হুজি’র সাথে লিয়াজো করা ও অর্থনৈতিক লেন-দেন করেছেন বলে গোয়েন্দা মহলে ব্যাপক প্রচারণা রয়েছে। বাংলাদেশকে অপবাদে বিব্রত করা এবং এ দেশের জাতীয়তাবাদী-ইসলামী শক্তিকে জঙ্গিবাদকে মদদ দানের দায়ে আসামীর কাঠগড়ায় টেনে আনার লক্ষ্যে বিশেষ মহলটি নকল জঙ্গি কারখানায় জঙ্গি বানিয়ে তাদের হাতে বোমা-বিস্ফোরক তুলে দিয়ে বাংলাদেশকে ক্রসফায়ারের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।

জঙ্গিবাদ দমন না করে বাংলাদেশের শত্র“পক্ষ স্থানীয় ভিন্ন মতের রাজনীতিকদের ওপর জঙ্গিবাদের অপবাদ চাপিয়ে তাদেরকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে।
শায়খ আবদুর রহমান- বাংলাভাই ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের গ্রেফতার এবং সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেকের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এতে জঙ্গিবাদ নির্মূলে বাংলাদেশের সাফল্য প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু দেশের ও দেশের বাইরের বেশ কিছু শক্তিশালী মহল বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নির্মূলে খুশি হতে পারেনি। তারা জঙ্গিবাদকে নেপথ্য থেকে মদদ দিয়ে ইসলাম ও বাংলাদেশের সপক্ষ শক্তিকে ঘায়েল করতে জঙ্গিবাদের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ ও লালন করতে চেয়েছে। শক্তিশালী মহলটির এই অসন্তুষ্টির জের ধরেই বিগত বিডিআর বিদ্রোহের সময় জেএমবি’র শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ শীর্ষ জেএমবি ক্যাডারদের গ্রেফতার করে তাদেরকে বিচারে সোপর্দ করে যেসব মেধাবী ও দেশপ্রেমিক আর্মি অফিসার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, কর্নেল গুলজারসহ তাদের প্রায় সবাইকে পিলখানা ঘটনায় হত্যা করা হয়েছে।

এমনকি হত্যার পর তাদের অনেকের লাশও বিকৃত করা হয়েছে। জঙ্গিবাদের গোখরো বাঁশির টানে তাদের নাচাতে চেয়েছে, তারা বাংলাদেশকে জঙ্গিপ্রবণ দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত করতে চেয়েছে। জঙ্গিবাদ নির্মূল করে বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল দেশ হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম হলে জঙ্গিবাদের হাইব্রিড প্রজনন ক্ষেত্রের দেশী-বিদেশী কুশীলবদের রাজনীতি থাকে না বলেই বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ নির্মূলের সাহসী ও দক্ষ সেনা অফিসারদের রহস্যজনক বিডিআর বিদ্রোহের ধূম্রজালে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন। এর ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ-বিডিআর যে কাউন্টার টেরোরিজম কর্মসূচি গড়ে তুলেছিলেন, তাকে আগের মতো কার্যকর রাখা হয়নি। বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার নারকীয় ঘটনায় বিদেশী কানেকশন সম্পর্কে একাধিক প্রাইভেট গোয়েন্দা অনুসন্ধানী গ্র“প ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে একমত পোষণ করেছেন।

সরকারিভাবে বিডিআর বিদ্রোহের যে তদন্ত করা হয়েছে, তাতে কমিটির চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান স্পষ্ট উল্লেখ্য করেছেন যে, তারা এই বিদ্রোহের প্রকৃত কার্যকারণ এবং বিদেশী কানেকশন উদঘাটন করার সময় পাননি। এ জন্য তিনি এনিয়ে আরও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সুপারিশ করেছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রায় দু’বছরেও সরকার এ নিয়ে আর কোন তদন্ত চালাননি। জেএমবি’র যেসব শীর্ষ নেতা ও ক্যাডারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের সংক্ষুব্ধ আÍীয়-স্বজন বিডিআর বিদ্রোহ সংগঠন ও টার্গেটভুক্ত সেনা অফিসারদের হত্যায় ইন্ধন জানিয়েছে বলে অনুসন্ধানী দল অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে।
ভারত একদিকে বাংলাদেশে উলফা ও অন্যান্য ইন্ডিয়ান স্বাধীনতাকামীদের ঘাঁটির প্রসঙ্গ যেমন ব্যাপকভাবে উত্থাপন করে বাংলাদেশকে চাপে রেখেছে, তেমনি তারা জেএমবির হুজিসহ অন্যান্য নাম না শোনা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন ব্যবহার করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সক্রিয়তা প্রমাণ ও সেই সাথে জঙ্গিবাদের সাথে সাবেক জোট সরকার, ‘হাওয়া ভবন’- তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে তথ্য-সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে।

তবে বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গিবাদের সাথে সরকারের তরফ থেকেই বিএনপি-জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দল এবং ব্যক্তিত্বকে জড়ানোর রাজনীতি করা হচ্ছে। ফলে জঙ্গিবাদ নির্মূলের বদলে এটি মহল বিশেষের সিক্রেট নীলনকশার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা ও রাজনীতিতে উপদ্রব হিসেবে বিরাজমান। বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ নির্মূলে রাজনৈতিকভাবে কতটা আন্তরিক ও কমিটেড এবং প্রশাসনিকভাবে কতটা দক্ষ, জনগণ তার প্রমাণ পায়নি। জঙ্গিবাদ দমনে যে ধরনের সামাজিক প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা সময়ের দাবি, সরকার তার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের বদলে জঙ্গিবাদ ইস্যুতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ঘায়েলের নোংরা প্রক্রিয়ার সম্পৃক্ত থাকতে উৎসাহী। সরকারের এই ‘ব্লেইমগেম’ ফর্মুলায় প্রকৃত জঙ্গি যদি কেউ থাকে, তবে তারাও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকছে। আবার নকল জঙ্গি কারখানায় তৈরি বিশেষ লক্ষ্যে পরিচালিত এসব রহস্যজনক জঙ্গিবাদের সাথে প্রকৃত জঙ্গিরা মিশে গিয়ে বড়ো ধরনের অঘটন ঘটানোর সুযোগও নিতে
পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন।

আওয়ামী লীগের অবদান
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব প্রমাণে আওয়ামী লীগ নেতা নেত্রীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। দেশেই নয়, দেশের বাইরে গিয়েও তারা বাংলাদেশকে ইসলামী জঙ্গিবাদ গিলে খেতে চলেছে বলে ব্যাপক প্রোপাগাণ্ডা চালিয়েছেন এবং এখন তারা একই ধারায় তাদের প্রোপাগাণ্ডা কর্মসূচি আরও বেগবান করেছেন।
১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত সময়কালে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্বে তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বেসরকারি আমন্ত্রণে ঢাকা সফরকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ সরকারিভাবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের কাছে ইসলামী জঙ্গিবাদ ভয়ংকর হয়ে উঠছে বলে সাক্ষ্য দেয়। তারা পররাষ্ট্র ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নিয়ে বুকলেট বানিয়ে মার্কিন ও অন্যান্য পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলি করেন। সরকারের এই প্রচারণাকে আমলে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তার নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের পরামর্শে গাজীপুরে তার পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচিসহ সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন কর্মসূচি বাতিল করেন।

তবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তখন জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থী ইসলামী জঙ্গি নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বক্তব্যের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে পরিষ্কারভাবে বলেন যে, বাংলাদেশে চরমপন্থী জঙ্গিবাদ ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক শক্তি হয়ে উঠেছে বলে তারা মনে করেন না। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ একটি মডারেট গণতান্ত্রিক মুসলিম দেশ। তারা এও মনে করেন যে, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক সহিষ্ণুতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি রোল মডেল দেশ হিসেবে বিবেচ্য।
কিন্তু এ সময় জঙ্গিবাদ ইস্যুতে আওয়ামী লীগ মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হলেও তারা এ নিয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে দেশে-বিদেশে অপপ্রচার চালাতে থাকে। এ সময়ই বেশ কিছু ভারতীয় ও পশ্চিমা মিডিয়ায় মতলবী সাংবাদিক-কলামিস্টরা আওয়ামী লীগের পক্ষে জঙ্গিবাদ নিয়ে প্রোপাগান্ডা মিশনে যুক্ত হয়।

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় তাদের জঙ্গিবাদ ইস্যু নিয়ে অপপ্রচারকে আরও জোরদার করার সুযোগ করে দেয়। তারা জনগণের ম্যান্ডেট না পেয়ে একদিকে বলতে থাকে যে, ‘স্থূল কারচুপি’ করে তাদের নির্বাচনী বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ তদানীন্তন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা চারদলীয় জোট সরকারের জঙ্গি-তালেবান ও আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের লোক রয়েছে বলে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে থাকেন। তাদের প্রচারণার টার্গেট ছিল বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ কবলিত হয়ে পড়েছে এবং চারদলীয় জোট, বিশেষ করে জোটের ইসলামী শরীক দলগুলো জঙ্গিবাদকে লালন ও মদদ দেয়। সুতরাং তারা মনে করেন, বাংলাদেশকে জঙ্গি ও তালেবানমুক্ত রাখতে হলে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সেক্যুলার শক্তিই হচ্ছে একমাত্র বিকল্প। একদিকে ভারতের আগ্রাসী এজেন্ডা বাস্তবায়নে জাতীয়তাবাদী ইসলামী শক্তি হচ্ছে তাদের জন্য বড়ো রাজনৈতিক বাধা। অন্যদিকে বাংলাদেশকে যে বিদেশী চক্র সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, তারাও মনে করেছে যে, আওয়ামী লীগ-মহাজোটকে ক্ষমতার দৃশ্যপটে নিয়ে আসা সম্ভব হলে সংবিধান পরিবর্তন করে বাংলাদেশকে সেক্যুলার রাষ্ট্র বানানো সম্ভব হবে। এক এগারো এবং তার আগের ঘটনা প্রবাহসহ সেনা সমর্থিত সরকারের ছক বাধা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মহাজোটের নিরংকুশ বিজয়ের মাজেজা এখানেই। জঙ্গিবাদের কার্ড ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে একই ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে ক্রুসেড শুরু করেছে।