‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ বলে যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া, সরকার তা সফল হতে দেবে না। তাঁর এ কর্মসূচির পক্ষে দেশে কিন্তু লোক আছে। সুশীল সমাজেও এর সমর্থক পাওয়া যাবে। তারা বলবেন, এটা তো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। বিএনপি ও জামায়াত মিলে এতদিন যে ধারায় হরতাল-অবরোধ পালন করেছে, তাতে অদৃষ্টপূর্ব মাত্রায় সহিংসতা হলেও বলা কি যাবে, এতে তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে?

সুশীল সমাজেও অনেকে আছেন, যারা বলে থাকেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি বলেই বিরোধী দল সহিংসতা শুরু করেছে। অতীতেও অনির্বাচিত ও নির্বাচিত সরকারগুলো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে দেয়নি। জেল-জুলুম মোকাবেলা করতে হয়েছে আন্দোলনকারীদের। এভাবে লিখলে আবার বলা হয়, বিরোধী দলের ওপর অন্যায়-অবিচারকে জাস্টিফাই করছেন কেন? গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক শাসনামল কি অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে ভিন্ন হবে না?

এও ঠিক, আমরা কি এগোব না? বিরোধী দল বা সংখ্যালঘুকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনার সংস্কৃতি গড়ে তুলব না? কিন্তু প্রশ্ন হল, আগেকার মতো জেল-জুলুম মোকাবেলা করতে হচ্ছে বলেই কি লাগাতার এমন সহিংস কর্মসূচি পালন করবে বিরোধী দল? অবরোধে এ পর্যন্ত কত নিরীহ মানুষ আগুনে পুড়ে মারা গেল! এখন যা হচ্ছে, তার কাছে ‘লগি-বৈঠার আন্দোলন’ কিন্তু নস্যি। ওই আন্দোলনে সাধারণ মানুষ এভাবে আক্রান্ত হয়নি। কতজন পুলিশ নিহত হয়েছে এ পর্যন্ত? কত মানুষ মারা গেছে তাদের গুলিতে? রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের হাতে পরস্পরের কত নেতা-কর্মী-সমর্থক নিহত হল নৃশংসভাবে? এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন কিন্তু বেশি। অথচ তারা এখনও রয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায়।

বিরোধী দলের নেত্রী কি আন্দোলনে সংস্কার আনবেন
বিরোধী দলের নেত্রী কি আন্দোলনে সংস্কার আনবেন

না, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে না মোটেই। এটা নতুন পরিস্থিতি। স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন দেখেছে এদেশের মানুষ। এমনটি তারা দেখছে এই প্রথম। অনেকে বলেন, জামায়াতে ইসলামী কঠিনভাবে যুক্ত হয়ে পড়াতেই এমনটি ঘটছে। বিএনপি একা এর অর্ধেকও করতে পারত না। অনেকে এভাবেও বলেন, জামায়াত তো এমনটি করবেই। তাদের অস্তিত্ব ধরে টান দিয়েছে সরকার, তারা কি ছেড়ে দেবে? তারা এমনভাবে বলেন, যেন জামায়াতের বিরুদ্ধে ঘোর অন্যায় কিছু করা হচ্ছে; আর এর প্রতিক্রিয়ায় তারা যেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে!

এ ‘যুদ্ধ’ থেকে নিজেদের আলাদা করতে পারছে না বিএনপি। এমন সমালোচনাও রয়েছে যে, কর্মসূচি ঘোষণা করছে বিএনপি আর তা ‘সফল’ করছে জামায়াত। এটা করতে গিয়ে দলটির কম কর্মী-সমর্থক মারা যাচ্ছে না। যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে তাদের বেশ কজনকে হত্যা করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। জামায়াতের ঘাঁটিতে অভিযান চালিয়ে যৌথবাহিনী তেমন সুবিধাও করতে পারছে না। দেশের বেশ কিছু ‘পকেট’ যেভাবেই হোক, তারা দখল করে নিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

সরকারি গোয়েন্দারা বসে বসে কী করেছে এতদিন? সরকারকে শুধু ইতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছে? কী করেছে ক্ষমতাসীন দল ওইসব স্থানে? কী নিয়ে ব্যস্ত ছিল তারা?

বিএনপির ক্ষমতাকে হালকা করে দেখাও ঠিক হয়নি। আন্দোলন বা নাশকতা যাই হোক দেশে, তাতে এ দলের ‘কন্ট্রিবিউশন’ কম নয়। সেসব স্থানে পরিস্থিতি একদম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, যেখানে বিএনপি ও জামায়াত দুটোই শক্তিশালী।

একটা কাজের কাজ কিন্তু হত, যদি সরকার মেয়াদের অন্তত চার বছরের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করে রায়গুলো কার্যকর করে ফেলতে পারত। তাহলে শেষ বছরে শুধু জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ইস্যু সামলাতে হত। তাতে সরকারের ভূমিকা সিংহভাগ মানুষের চোখে মন্দ হলেও পরিস্থিতি এত জটিল হত না। সরকার কি এটা করতে পারেনি? নাকি ইচ্ছা করেই দুটি ইস্যুকে এক সময়ে নিয়ে এসেছে?

দ্বিতীয় প্রশ্নটি নিয়ে বাজারে উড়ে বেড়াচ্ছে একাধিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। কিছু লোক এটা বিশ্বাস করে তো কিছু লোক ওটা। অনেকে বিভ্রান্তও হয়। এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়, যারা সরকারের একটি কাজ সমর্থন করতে পারলেও অন্যটি পারছে না।

এ ডামাডোলে অনেকে আবার মনে করেন, সরকার যেভাবে নির্বাচনটা করতে চাইছে, তাতে শামিল হয়ে যাওয়াই উচিত ছিল বিরোধী নেত্রীর। ‘প্রতিবাদের অংশ’ হিসেবে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলেও তারা নাকি জিতে যেতেন। একাধিক জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন তারা। তাছাড়া সরকার যত উন্নয়নকাজই করুক, বেশিরভাগ মানুষ নাকি বিগড়ে গেছে। বিগড়ে যেতে জনগণের একটি বড় অংশের বেশি কিছু লাগে না। ঠিকমতো ম্যানেজ করতে না পারা দু-চারটা ঘটনা বা ইস্যুই অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট।

বিরোধী দলের ভূমিকা এদেশে মিডিয়াও কম মূল্যায়ন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। গণতন্ত্র সফল বা সরকারকে ঠিকমতো দেশ চালাতে বাধ্য করায় তাদের যেন কিছু করণীয় নেই। যে কোনো প্রকারে তারা কি আন্দোলনও করতে পারে, দিতে পারে সহিংস কর্মসূচি?

জানি, বহু লোক বলে বসবেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তো সহিংসতা হয়েছিল। হ্যাঁ, কিছু মাত্রায় সহিংসতা হয়েছিল বেগম জিয়ার প্রথম শাসনামলে– যখন তিনিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যেতে চাইছিলেন না। খুঁজলে দেখা যাবে, স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগেও কিছু সহিংসতা হয় রাজপথে। ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনেও এ প্রবণতা ছিল। কিন্তু লক্ষণীয়, গান্ধী তার আহুত হরতাল প্রত্যাহার করলেন, যখন দেখলেন এতে জ্বালাও-পোড়াও হচ্ছে।

স্বাধিকার বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান আন্দোলনের তুলনা চলে না। তারপরও বিষয়গুলো উল্লিখিত হল এটা বলতে যে, তুলনায় দাবি সামান্য হলেও তা আদায়ে অনেক বেশি সহিংসতা করছে এখনকার সরকারবিরোধীরা। তাদের তরফ থেকে আবার অস্বীকার করা হচ্ছে সহিংসতার কথা। বিশেষত বিএনপির পক্ষ থেকে বলে দেওয়া হচ্ছে, এগুলো করছে সরকারের লোকজন!

‘সরকারের লোকজন’ সহিংসতা করে সরকারকেই বিপাকে ফেলছে! সরকার নিজে এর আয়োজন করে নিজেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যর্থ বলে প্রতিপন্ন করছে! এই যে এত পুলিশ (এমনকি বিজিবি সদস্য) মারা গেল, এতে কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নৈতিক মনোবল ভেঙে পড়তে পারে। সরকার নিজে কি চাইবে, তাদের মনোবল ভেঙে পড়ুক?

মুশকিল হল, বহু লোক এসব বিশ্বাস করে। দলকানা লোকজন তো করেই, এর বাইরের লোকও করে। দু-একটা ঘটনা যে সরকার ঘটাতে পারে না, ঘটায় না, তা নয়। বিরোধী দল সেটা পরিষ্কারভাবে জেনে থাকলে তাদের উচিত তথ্য-প্রমাণ দেওয়া। আর রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারলে তাদের দায়িত্ব হবে অভিযোগ প্রমাণ করা। এমন অভিযোগ কিন্তু দু’পক্ষ থেকেই আছে। তাদের কেউ কি এর কোনো একটি প্রমাণ করতে পেরেছেন? উদাসীন লোকজনও এসব নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

একই সময়ে এশিয়ার পরিচিত দেশ থাইল্যান্ডেও সরকারবিরোধী আন্দোলন হচ্ছে। সেটি কিন্তু প্রকৃত অর্থেই আন্দোলন। তাই এতে তেমন কোনো সহিংসতা হচ্ছে না। লাখ লাখ মানুষ রাজপথে অবস্থান নিচ্ছে সেখানে। সরকারি ভবনের দখল নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে পর্যন্ত বাধ্য করেছে তারা। নির্বাচনকালে ‘নির্দলীয় পরিষদ’ গঠনের দাবিও জানাচ্ছে তারা অনেকটা বাংলাদেশের অনুকরণে। কিন্তু কেউ কাউকে পিটিয়ে, কুপিয়ে বা পুড়িয়ে মারছে না। রেললাইন উপড়ে ফেলে নিরীহ যাত্রী হত্যার ব্যবস্থা করছে না থাইরা।

এদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও রেললাইন তুলে ফেলা হয়েছিল ‘বড় খবর’ তৈরি করতে। তবে সেখানে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল লাল পতাকা, যাতে ট্রেনটা থেমে যায়। জামায়াতের কথা আলাদা; কিন্তু বিএনপি কেন অনুমোদন করল এসব? মিডিয়ায় তথ্য রয়েছে, তাদের লোকজনও একাধিক স্থানে রেললাইনে নাশকতা চালায়। এমন একটি ঘটনায় কয়েকজন নিরীহ যাত্রীর মৃত্যুও কিন্তু নিশ্চিত করা হয়েছে। বিএনপি কি নিন্দা করেছিল এর? নাকি ‘আন্দোলন’ মজুবত হচ্ছে বলে খুশি হয়েছিল?

বাংলাদেশের জবাবদিহিহীন রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত এসব দলের ‘ইনার মাইন্ড’ জানা আছে। সন্দেহ নেই, বর্তমান সরকারও যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় ফিরে আসতে চায়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি এ ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা জোগাবে কিনা এ নিয়েও নানা মত রয়েছে। অনেকে দেখি মনে করছেন, সরকার এতে শক্তিশালী হবে এবং আন্দোলন দমন হয়ে যাবে সহজেই। নিজ এলাকায় প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের এক নেতা শুধু জানতে চান– ‘সরকার দুইটা বছর টিকতে পারব তো’– তাহলে তার নির্বিঘ্ন ঠিকাদারি আরও দু’বছর চলতে পারে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা আছে তার।

তবে অনেকেই কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজটা সুসম্পন্ন দেখতে চান এ সুবাদে। আর কিছুই চান না আওয়ামী লীগের কাছ থেকে। এদের একটা অংশ সত্যি কিন্তু বিএনপিকে গ্রহণ করত, যদি এ ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করত দলটি। সেটি তারা করেনি, নাশকতাময় আন্দোলনে দেশ-বিদেশে সমালোচিত হওয়ার পরও। এখন প্রশ্ন হল, এতে কি সামগ্রিকভাবে তাদের ভোট কমেছে? সেটা বোঝা যাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কাছাকাছি সময়েই যদি আরেকটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমাদের মতো দেশে ভোটে জয়-পরাজয় নির্ধারণে আরও কিছু উপাদানের ভূমিকা অবশ্য থাকে। কোন প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনায় নির্বাচনটা হচ্ছে, তা একটি বড় বিষয়। বিশ্বসম্প্রদায়সহ দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ ও প্রচারে এগিয়ে থাকাটাও। এগুলো নিজের তাঁবে বা পক্ষে রাখা গেলে ভোটদাতাও প্রভাবিত হয়। এ বিষয়ে আলোচনা আপাতত মুলতবি রাখাই ভালো।

প্রশ্ন হল, ২৯ ডিসেম্বর বড় কিছু ঘটাতে পারবে কি বিরোধী দল? কিংবা সেটি ধরে লাগাতার আরও বড় কিছু যাতে নির্বাচনটাই না হয়? নির্বাচন অবশ্য অর্ধেকেরও বেশি হয়ে আছে। গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটা নাকি অভিনব। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, মাঠ ফাঁকা পেলে গোল তো দেবই!

৫ জানুয়ারির পর আন্দোলনের মাঠ কী রূপ পরিগ্রহ করবে সেটা দেখা দরকার। এর নামে আরও সহিংসতাই কি দেখব আমরা, নাকি আন্দোলনে সংস্কার আনবেন বিরোধী নেত্রী? ঢাকামুখী যাত্রা বা এ জাতীয় কিছুর মাধ্যমে তিনি যদি আসলে সেটাই চান, তাহলে একে স্বাগত জানাব। আন্দোলনকে জনসম্পৃক্ত করে তুলুন। জামায়াত এতে বাধ সাধলে বাদ দিন তাকে। অন্য কারণেও ওই দলের বিষয়ে অবস্থান নেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে। একাত্তর প্রশ্নে পরিশুদ্ধ অবস্থান নিয়ে যদি (ইসলামপন্থী হিসেবেও) নতুন ধারায় চলতে পারত দলটি, তাহলে কিন্তু সমস্যা ছিল না।

হয়েছে তার উল্টো। নির্বাচনের পর জামায়াত বোধহয় নিষিদ্ধ হতে চলেছে। এর আইনগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিন্তু তৈরি। বিশ্বসম্প্রদায়, বিশেষত প্রতিবেশি প্রভাবশালী দেশও দলটিকে দেখছে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে। বেগম জিয়া কিন্তু তাদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। দেশি-বিদেশি যারাই এখানে শান্তিমতো ব্যবসা করতে চায়, তারাও চাইবে না অব্যাহত নাশকতা বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হয়ে থাকুক বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক সূচকগুলো বলছে, এ দেশ সম্ভাবনাময়। এমন একটি দেশ নিয়ে সরকার পক্ষও যেন বেশি নাড়াচাড়া না করে। প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার কোনো বিকল্প তো নেই।