গত ১ জুলাই ২০১৬ ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে দেশি বিদেশি নাগরিকসহ আনুমানিক ৩৩ জনকে জিম্মি করে। জিম্মি ঘটনার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ওই রেস্তোরাঁর নিয়ন্ত্রণ নেয় সশস্ত্রবাহিনী। ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ২০ জনের লাশ পাওয়া যায় জবাই করা অবস্থায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম জঙ্গি হামলা যেখানে জিম্মিদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পাঁচ জঙ্গির পরিচয় বের হওয়ার পর দেখা যায় তাদের কারও বয়স-ই ২৫ এর উর্ধ্বে নয় এবং এর মধ্যে তিনজন অভিজাত-শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। সেদিন রাতেই IS ঘটনার দায় স্বীকার করে। এই জঙ্গি হামলার পর মানুষের প্রতিক্রিয়ার দুইটি দিক পর্যবেক্ষন করে দেশের সমকালীন পরিস্থিতির উপর সাধারণের সচেতনতা ও বিবেচনাবোধ নিয়ে বেশ সংশয় অনুভব করছি।
1. অভিজাত পরিবারের সন্তানদের জঙ্গি সংগঠনের রিক্রুট হতে দেখে অনেকেই আকাশ থেকে পরছে, যেন আমাদের দেশে এটাই প্রথম কোন হত্যাকাণ্ড যেখানে জঙ্গিরা শিক্ষিত ও আধুনিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা যুবকদের ব্যবহার করেছে।
2. IS এর সাথে দেশীয় বিভিন্ন জঙ্গি সঙ্ঘঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ(JMB), আনসারুল্লাহ বাংলা টীম (ABT), হিজবুত তাহরীর(HT), জামায়াত-শিবির এর জড়িত থাকার বিষয়টাকে অনেকের চোখেই সরকারের “ব্লেম-গেম” বলে মনে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন জঙ্গি হামলার আলোকে উপরের এই দুইটি দৃষ্টিভঙ্গির যথার্থতা ব্যবচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে এই নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ।
বাচ্চা বাচ্চা অভিজাত-শিক্ষিত ছেলেগুলা কার কথায় এতো convinced হলো?

বাংলাদেশে গুলশান হামলার পটভূমি রাতারাতি তৈরি হয়নি। বিষয়টা এমন না যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করতে করতে বিরক্ত হয়ে একদিন সকালে IS জঙ্গিদের মনে হল

ধুর, শুধু মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপে আর ভালো লাগছে না। বাংলাদেশে তো জঙ্গি বানানোর জন্য অনেক পটেনশিয়াল মুসলিম আছে, ইয়া হাবিবিজ, চল ওদের মগজ ধোলাই দেই আর বাংলাদেশে চটপট কিছু হামলা করি।

মগজ ধোলাই, কর্মী সংগ্রহ, ট্রেনিং, জঙ্গি প্রস্তুত করার এই কার্যক্রম ১-২ বছরের না, কয়েক দশকের। যুগ বদলানোর সাথে সাথে তাদের কার্যক্রম এর ধারায় নতুনত্ব এসেছে। কওমি মাদ্রাসার গণ্ডি পেরিয়ে সেটা ঠেকেছে আধুনিক পরিবেশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দোরগোড়ায়। গত তিন বছরের কিছু ঘটনা উল্লেখ করা যাক।
◦ ২০১৩ এর থাবা বাবার হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় নর্থ-সাউথ এর মত স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছয় শিক্ষার্থীর। এদের মধ্যে দুই জনের ফাঁসি এবং বাকি চারজনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়। তাদের মধ্যে জঙ্গিবাদের বীজ বপন করে আনসারউল্লাহ বাংলা টীম। ABT এর প্রধান মুফতি মো. জসীমউদ্দিন রাহমানী মসজিদে জুমার খুতবায় ধর্মের বিরুদ্ধে লেখে এমন ব্লগারদের হত্যার ফতোয়া দিল। হুজুরের এই অমোঘ আদেশে উজ্জীবিত হয়েই তারা ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পল্লবীতে বাসার সামনে চাপাতির কোপে হত্যা করে থাবা বাবা ওরফে রাজীব কে। সমুজ্জিত করে তাদের ঈমানের ঝাণ্ডা।
◦ একই বছর হেফাজতের সমাবেশে আসা লোকজনকে খাবার সরবরাহ করার কাজে বাঁধা দেয় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ রায়হান দ্বীপ। “হেফাজতের সমাবেশে খাবার পাঠাতে না দেওয়া মানে দ্বীনের পথে আঘাত করা” – এই মর্মে বিশ্বাসী বুয়েটের-ই স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র, হেফাজতে ইসলামের সক্রিয় সমর্থক, মেজবাহ বুয়েট ক্যাম্পাসের নজরুল ইসলাম হলের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দ্বীপ কে।
◦ ২০১৪ এর সেপ্টেম্বরে মো. আসিফ আদনান (২৬) ও মো. ফজলে এলাহী তানজিল (২৪) নামের দুই যুবককে ঢাকার রমনা ও সেগুনবাগিচা থেকে আটক করে পুলিশ। দুইজন-ই আনসারউল্লাহ বাংলা টীমের সদস্য। এদের মধ্যে আদনান সুপ্রিম কোর্টের সাবেক এক বিচারপতির ছেলে এবং তানজিলের মা একজন ওএসডি যুগ্ম সচিব। এই দুই যুবকের উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে IS এর সাথে যুদ্ধে যোগ দান করা। কিন্তু আগেভাগে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে তথ্য চলে আসায় ভেস্তে যায় তাদের প্ল্যান।
◦ ২০১৫ এর ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার মিরপুর-১ এ প্রায় ১৪ ঘন্টার অভিযান শেষে গ্রেপ্তার হয় তিন জেএমবি সদস্য। তাদের কাছে পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ তাজা গ্রেনেড, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও আগ্নেয়াস্ত্র। এদের মধ্যে একজন জঙ্গি ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সেস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবু সাঈদ ওরফে রাসেল ওরফে সালমান(২২)। সে ছিল জেএমবির এই বোমা বানানোর গ্রুপের সমন্বয়কারী সদস্য।
◦ IS মুখপত্র ম্যাগাজিন দাবিক – ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ সংখ্যায় উঠে এসছে আবু জান্দাল আল বাঙ্গালি নামক ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের তরুণের কথা। আবু জান্দাল এর বাবা ছিল ২০০৯ এর বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা সদস্য। এলাকার কোন এক বড় ভাই সবসময় জান্দাল কে ভালো কাজ(!) ও দ্বীনের পথে থাকতে উদ্বুদ্ধ করত। কঠোর দ্বীন সাধনার পাশাপাশি সে আনওয়ার আল আওলাকির ধর্মীয় বক্তৃতা শুনতো এবং ইবনে তায়মিয়াহ মোহাম্মাদ ইবনে আব্দিল ওয়াহাবের বই পড়তো। কিন্তু এতে তার জিহাদি মন শান্ত হতনা। জিহাদের তাড়ণায় উদ্বুধ্ব হয়ে একসময় সে ঠিক করে সিরিয়ার ISIS এর সাথে যোগদান করবে। এর মধ্যেই বিদেশী কনফারেন্সে যাওয়ার মিথ্যা কথা বলে দেশের বাইরে পাড়ি দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যোগাড় করে ফেলে। ডিজিএফআই এ কর্মরত আবু জান্দাল এর মামা শেষ মুহুর্তে তার উদ্দেশ্য টের পায়। জান্দালের সিরিয়া যাওয়া বন্ধ করার জন্য ভদ্রলোক অনেক চেষ্টা করলেও ততদিনে জান্দাল জিহাদের পথে। ২০১৬ এর এপ্রিল মাসে সিরিয়ার আইন ইসা এলাকায় এক লড়াইয়ে আবু জিন্দাল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।
◦ এই বছরের ১৫ জুন মাদারীপুরের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিমকে। এসএসসি তে জিপিএ-৫ পাওয়া ১৮ বছর বয়সী ফাহিম উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিল। তবে রসায়ন বিজ্ঞানের পরীক্ষা না দিয়েই সে ১১ জুন সকালে ঢাকার দক্ষিণ খানের বাসা থেকে নিরুদ্দেশ হয়। পরিবারের আশঙ্কা, শান্ত নরম স্বভাবের এই ছেলেটি ঢাকার কোন এর কলেজের বড় ভাই এর খপ্পরে পরে বিপথে চলে যায়।
◦ যদিও বাংলাদেশের বাইরের ঘটনা তবুও পোর্টসমাথ এর বাঙ্গালি পরিবারের সন্তানদের জঙ্গি হওয়ার ঘটনাটি এখানে উল্লেখ না করে পারছি না। ২০১৩ এর অক্টোবরের দিকে ইংল্যান্ড এর পোর্টসমাথ থেকে ছয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিম তরুণ সিরিয়ায় চলে যায় ISIS এর সাথে যোগদানের উদ্দেশ্যে। কিছুদিন পর অস্ত্র হাতে তাদের ছবি-ভিডিও জেহাদি ওয়েবসাইটগুলোতে দেখা যেতে থাকে এবং বছর খানেকের মাথায় ঐ ছজনের মধ্যে একে একে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পায় স্বজনরা। সর্বশেষ মৃত্যুর খবর এসেছে ২০১৫ এর জুলাইতে ইফতেখার জামানের। মাসুদুর চৌধুরী নামে একজন শুধু বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছে। সে এখন সন্ত্রাস আইনে ব্রিটেনের কারাগারে। পোর্টস্মাথ এর এই যুবকদের অনেকেই উচ্চশিক্ষার অধিকারী ছিল, কারও স্বপ্ন ছিল আইনজীবী হওয়ার। কিন্তু তাদের শেষ পরিচয় হয় IS জঙ্গি। এই তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সন্দেহের তীর যায় স্থানীয় একটি মসজিদ এর উপর।

জঙ্গিরা তাদের কিলিং মিশনের সৈন্য শুধুমাত্র মাদ্রাসা অথবা গরিব ঘরের সন্তানদের থেকেই সংগ্রহ করছে এই ভেবে যদি অভিবাবকরা নিশিন্ত মনে বসে থাকেন তাহলে আপনারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। উপরে উল্লিখিত প্রতিটি ঘটনা পত্রিকায় এসেছে, টিভি স্ক্রলে বেশ গুরুত্বসহকারেই দেখানো হয়েছে। আপনি হয়ত নৃশংস জঙ্গিবাদ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না, কিন্তু তার মানে এই না যে আপনার সন্তানের মগজধোলাই করে তাকে জঙ্গিতে রূপান্তর করার সম্ভাবনা নেই। পাবলিক-প্রাইভেট-মাদ্রাসা সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই চলছে এই কর্মী সংগ্রহের কাজ। তাই আপাত দৃষ্টিতে দেখা চুপচাপ, মাথা নিচু করে নিম্নস্বরে কথা বলা ছেলেটির মধ্যে কোনরকম অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসার আগেই সে কাদের সাথে মিশছে, কোন বিষয়ে অসহিষ্ণু মনোভাব প্রকাশ করছে কিনা সে দিকে অভিবাবকের নজর রাখা উচিৎ।

IS থাকতে জেএমবি, আনসারউল্লাহ, জামায়াত কে নিয়ে কেন টানাটানি?

এবার নজর দেওয়া যাক সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া কিছু জঙ্গি হামলার দিকে। আনসারুল্লাহ বাংলা টীম তাদের জঙ্গি কার্যক্রম এর জানান দেয় ২০১৩ এর ১৫ জানুয়ারি ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন এর উপর হামলার মাধ্যমে। ২০১৬ এর এপ্রিল পর্যন্ত তারা ১৩ টি হামলার দায় স্বীকার করে, যাতে নিহত হয় ১১ জন নিরপরাধ মানুষ। ব্লগার রাজীব হায়দার ওরফে থাবা বাবা, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাশ, নিলাদ্রী নীল, জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন সহ সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা জুলহাজ মান্নান প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল হোতা হিসেবে দাবি করে আসছে এই আনসারুল্লাহ বাংলা টীম। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পূর্বেই তারা একটি স্লীপার টীম গঠন করে। এই স্লীপার টীমের সদস্যরা টার্গেটেড ব্যক্তির দৈনন্দিন কর্মাকান্ডের উপর নজর রেখে পরবর্তীতে হত্যা পরিকল্পনা তৈরি করে ও তা বাস্তবায়ন করে।
বাংলাদেশে IS তার অবস্থান দাবি করে আসছে ২০১৫ এর ২৮ সেপ্টেম্বর ইটালীয় নাগরিক তাভেল্লা সিজার এর হত্যার মধ্য দিয়ে। এ পর্যন্ত তারা বাংলাদেশে ১৯ টি হামলার দায় স্বীকার করে এসেছে। জাপানী নাগরিক কনিও হোশি, হোসাইনী দালানে বোমা হামলা, মন্দিরের পুরোহিত, যাজক, ভিক্ষু, অধ্যাপক এধরণের টার্গেট কিলিং এর পর সর্বশেষ ১ জুলাই গুলশানের ভয়াবহ হামলা। IS এর ‘টার্গেট কিলিং’ এর কয়েকটির ধরণ মিলে যায় আনসারউল্লাহ বাংলার টীমের কিলিং মিশনের সাথে। হত্যার আগে একই ভাবে ভিক্টিম কে নজরে রাখা, চাপাতির কোপে মস্তকচ্ছেদ এই বিষয়গুলোতে বেশ মিল পাওয়া যায় দুই দলের হত্যাকান্ডে। গুলশান হামলার প্রায় ১০ ঘণ্টা আগে টুইটারে @Ansar_Islam_BD নামের একটি একাউন্ট থেকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পাড়ায় হামলার ব্যাপারে টুইট করা হয়। হামলা করার কিছুক্ষণ পর হামলা শুরু হয়েছে বলে আরেকটি টুইট করা হয়। যদিও পরবর্তীতে টুইটগুলো মুছে ফেলা হয় অথবা প্রোফাইলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আনসারউল্লাহ বাংলার টীমের সাথে IS এর যোগসাজশ না থাকলে হামলার আগে ও পরে হামলা সঙ্ক্রান্ত তথ্য আনসারউল্লাহ বাংলার টীমের কাছে থাকার কথা নয়।
এবার গুলশান হামলার কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার উপর নজর দেওয়া যাক। ২০১৪ তে আনসারউল্লাহ বাংলার টীমের দুই সদস্যের IS এর সাথে যোগদানের চেষ্টা ব্যর্থ হয় পুলিশের হস্তক্ষেপে। এই ঘটনার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৫ এর ডিসেম্বরে সিঙ্গাপুর থেকে ২৬ বাঙ্গালিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয় তাদের সশস্ত্র জঙ্গি মনোভাবের জন্য। এরা বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করছিল। এদের কাছে জিহাদি বই পত্র, জিহাদি ট্রেনিং এর ভিডিও, বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে কিভাবে ‘সাইলেন্ট কিলিং’ এ অংশগ্রহণ করতে হয় এসবের ভিডিও টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ১৪ জনের আনসারউল্লাহ বাংলার টীমের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০১৬ এর মে মাসে আবারও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ৮ জন্য বাংলাদেশিকে। এই ৮ জনের দলনেতা মিজানুর রহমান স্বীকার করে ২০১৩ থেকেই তার মধ্যে জিহাদের প্রতি আকর্শন ছিল। ২০১৫ তে বাংলাদেশে অবস্থানকালে IS এর কর্মকান্ড সম্পর্কে ধারনা দানের মাধ্যমে তার মধ্যে সশস্ত্র জিহাদের জোশ পাকাপাকি ভাবে গেড়ে দেয় অপর এক বাঙ্গালি।
২০১৫ তে গ্রেপ্তারকৃত এক জেএমবির এক জেলা প্রধান এরশাদের জবানবন্দিতে বের হয়ে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার জবানবন্দি অনুসারে, ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমার এর কিছু অংশ নিয়ে একটি পরিপূর্ণ ইসলামিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের জন্য একসাথে কাজ করে যাচ্ছে এই অঞ্চলের বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী। আর এদের মাথার উপর ছায়া হয়ে আছে IS. IS এর খুরাসন পুনরুদ্ধারের স্বপ্নের সাথে জেএমবি সদস্যের এই জবানবন্দি মিলে যায়। এই উদ্দেশ্যে ২০১৪ এর অক্টোবরে সিরিয়া থেকে IS এর চার সদস্য বাংলাদেশে এসে ঘুরে যায়। এসময় তারা জেএমবি, হরকতউল জিহাদ, হিজবুত তাহরীর, আনসারউল্লাহ বাংলা টীম, শিবির এর নেতাদের সাথে বৈঠক করে এবং একসাথে কাজ করার ব্যপারে একমত হয়। এই জেএমবি বেশ কিছুদিন ধরেই খুব অরগানাইজড ভাবে বাংলাদেশে তাদের কাজ চালিয়ে আসছে। এরশাদ এর ভাষ্যমতে, সে জেলা প্রধান থাকা অবস্থায় তার অধীনে ১৫ জন কমান্ডার ছিল যারা নিয়ন্ত্রণ করত ১৫০ জন্য এশার(প্রধান সদস্য), ৫০০ জন্য গাইরি-এশার(মধ্যম পর্যায়ের সদস্য) এবং বেশ কিছু আনসার(মাঠ পর্যায়ের কর্মী)। এক লেভেলের কর্মী শুধুমাত্র তার সরাসরি দ্বায়িত্বে থাকা উপরের লেভেলের কর্মীর সাথে যোগাযোগ করতে পারত। আর গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য সকল সদস্য-ই সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে থাকত। মুদি দোকানদার, রাজমিস্ত্রি অথবা হকার ইত্যাদি বিভিন্ন ছদ্মবেশে তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করে আসছে। প্রসঙ্গত এই এরশাদ ২০১১ সালে দিনাজপুরের বালন্দর হাই স্কুল এর শিবির কর্মী ছিল। জেএমবিতে তার যোগদান আরেক শিবির কর্মী ফুয়াদ এর হাত ধরে যে কিনা নিজেও একজন জেএমবি সদস্য ছিল।
২০১৪ এর অক্টোবরে ভারতের বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার সাথেও এই জেএমবির জড়িত থাকার কথা উঠে আসে। এই বছরের স্বাধীনতা দিবস এবং পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলারও পরিকল্পনা ছিল জেএমবির। ১৪ মার্চ ঢাকার মিরপুরে এক বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় পাঁচ জেএমবি কর্মীকে যাদের কাছে পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির উপকরণ ও বিস্ফোরক দ্রব্যাদি। প্রায় তিন মাসের মধ্যে উদ্ধার হয় জেএমবির দুইটি বোমা তৈরির কারখানা, তাও আবার একই মিরপুরে।
২০১৬ এর জুন মাসে বাবুল আক্তারের স্ত্রীর হত্যাকান্ডের পর পুলিশ যখন সারাদেশে সাড়াশি অভিযান চালাচ্ছে তার-ই মাঝে নারায়ণগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দেখা যায় হিযবুত তাহরীরের পোস্টার। এসব পোস্টারে ১৭ জুন শুক্রবার জাতির উদ্দেশ্যে ‘বিশেষ আহ্বান’ জানানো হয় যেন জনগণ বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জেগে উঠে। অবশ্য সেদিন তারা কী করবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই। বিষয়টা হয়ত বেশ কাকতাল হয়ে যায়, কিন্তু ১৮ জুন উত্তরার দিয়া বাড়ির খালের পার হতে উদ্ধার করা হয় সাতটি ট্রাভেল ব্যাগ ভর্তি ৯৭ পিস্তল, ৪৬২ ম্যাগাজিন, এক হাজার ৬০ গুলি, ১০ বেয়নেট এবং ১০৪ গুলি তৈরির ছাচ। অস্ত্রগুলো সচল এবং ঐ মুহুর্তেই ব্যবহার উপযোগী ছিল। পরের সপ্তাহে একই জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও ৩টি ব্যাগ। এবার পাওয়া যায় ওয়াকিটকি, রিপিটার এবং বিভিন্ন প্রকার ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেগুলো দিয়ে শক্তিশালী বোমা তৈরি করে বড় ধরনের নাশকতা করা যায়। সবচেয়ে বড় বিষয় গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের সাথে উত্তরার উদ্ধারকৃত এই অস্ত্রগুলোর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।

বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার সাথে জেএমবি, আনসারউল্লাহ বাংলা টীম, হিজবুত তাহরীর এর যোগসাজশ এর কথা সবাই কম বেশি হলেও স্বীকার করে। কিন্তু জামায়াত ইসলাম ও ছাত্র শিবির এর জঙ্গি হামলার সাথে জড়িত থাকার কথা আসলেই সবাই একযোগে “আওয়ামী প্রোপাগান্ডা” বলে উড়িয়ে দেয়। অথচ খোদ IS এর মুখপাত্র-ই স্বীকার করে জামায়েত ইসলাম এর কর্মীদের সাথে IS এর সংশিষ্টতার কথা। IS মুখপত্র ম্যাগাজিন দাবিক – ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ সংখ্যার পৃষ্ঠা ৬০ এ স্পষ্ট করে বলা আছে, জামায়েত ইসলামীর নেতাদের “বাংলাদেশের তাগুতি সরকার” নির্মম ভাবে খুন করায় তারা এখন গণতন্ত্র ছেড়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর “তাগুতি সরকার ব্যবস্থা” কে বর্জন করে খিলাফতের যুদ্ধে সামিল হওয়ার কারণে IS জামায়েত ইসলামের কর্মীদের বুকে তুলে নিয়েছে।

DĀBIQ: With the tāghūt government’s betrayal and execution of several murtaddīn from the so-called “Jamaat-e-Islami,” have the followers of this party taken a lesson and repented from democracy?

SH. ABŪ IBRĀHĪM: In recent times, the tāghūt government has imprisoned and executed many of the leaders of “Jamaat-e-Islami.” This is similar to what happened to the sahwāt in Iraq and the Ikhwān in Egypt, as the sunnah of Allah never changes. He will humiliate and punish in this world and the Hereafter whoever abandons the religion and allies with the kuffār. There are some grassroots level followers and supporters of “Jamaat-e-Islami” who have repented from their shirk and joined the ranks of the Khilāfah’s soldiers in Bengal, walhamdulillāh.

শুধুমাত্র IS নয়, জেএমবির সাথে জামায়াত ইসলাম এর সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছে খোদ জামায়াত ইসলামীর নেতা যুদ্ধপরাধী কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামান । উইকিলিকস কর্তৃক প্রকাশিত ২০০৬ এর ২৪ জানুয়ারির এক তারবার্তায়। কাদের মোল্লার সাথে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক কর্মকর্তার কথোপোকথনটি দেখা যাকঃ

JI(Jamaat-e-Islam) has not been weakened by the association with JMB, he (Abdul Quader Molla) said. While some JMB members had associations with JI, particularly the student wing, he said that by their own admission JMB members left as they disagreed with the JI stance on adhering to the democratic process.

এবার দেখা যাক ২০০৫ এর ২৩ ডিসেম্বরের তারবার্তায় জামায়েত এর আরেক যুদ্ধাপরাধী নেতা কামারুজ্জামান এর বক্তব্যঃ

When asked, Kamaruzzaman said there were no current JIB (Jamaat-e-Islam-Bangladesh) members that are members of JMB. He said that a member of JMB can be a former JIB member, but will never return to the JIB party.

অর্থাৎ দুই জন্যের প্রত্যেকেই স্বীকার করছে জেএমবি সদস্যদের অনেকেই আগে জামায়াত এর কর্মী ছিল। খালেদা জিয়ার তৎকালীন উপদেষ্টা কামাল সিদ্দিকি জেএমবি এর সাথে জামায়াত এর দহরম মহরম নিয়ে আরও সরেস তথ্য দেন। (১৫ ডিসেম্বর ২০০৫ এর তারবার্তা) তার মতে জামায়াত বিএনপির সাথে ২০০১-এ জোট করার পর জামায়াতের নেতাদের একটা অংশ যোগ দেয় জেএমবিতে এবং জামায়াত সবসময়-ই তাদেরকে সহযোগিতা করে আসছে। ২০০৫ এ বাংলা ভাই এর সেকন্ড-ইন-কমান্ড মাহতাব উদ্দিন কামারুল গ্রেপ্তার হওয়ার পরে তারেক জিয়া ফোন করে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য করে র‍্যাবকে।

Siddiqui immediately raised the spate of attacks attributed to Jamaat’ul Mujahadin Bangladesh (JMB). He acknowledged BDG missteps, in particular its failure to recognize JMB’s terrorist potential and the protection of senior JMB figures by influential BNP leaders. JMB, he said,
is filled with former Jamaat Islami (JI) members who broke away when JI aligned with BNP. Some JI members, he said, maintain supportive links to JMB.

Siddiqui stated that the Rapid Action Battalion had arrested Kamarul, Bangla Bhai’s reputed deputy, but that an agitated Home Minister of State Babar had complained that he had been forced to release him quickly after the intervention of Tarique Rahman, PM Zia’s son and heir apparent, acting at the behest of State Minister for Land Dulu. He referred to Tarique as “Wind Tunnel,” a translation of the name of his Hawa Bhaban office. “Wind Tunnel has some psycho friends” that he listens to because of his lack of experience, Siddiqui groaned.

যে সংগঠন বাংলাদেশের অস্তিত্বকে পদে পদে অস্বীকার করে, কিছুদিন আগেও যারা সরকার পতনের জন্য মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে, সেই সংগঠনের নেতাদের নির্মুল করা হচ্ছে, তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো হুমকির মধ্যে পড়ছে আর তারা বিনা বাক্যে কোন ধরণের প্রতিশোধ না নিয়েই সুবোধ বালকের মত বসে থাকবে এটা কোন বিবেচনাবোধ সম্পন্ন মানুষ বিশ্বাস করবে না।
বাংলাদেশে IS জঙ্গিরা তাদের আস্তানা পাকাপোক্ত করার জন্য মাঠে নেমে পড়েছে এই কথাটা যেমন অস্বীকার করা হঠকারিতা, ঠিক তেমনি IS এর এদেশীয় সহযোগী জামায়াত, জেএমবি, আনসারউল্লাহ বাংলা টীম, হিজবুত তাহরীর এর জড়িত থাকার বিষয়টি এড়িয়ে গেলে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব নয়। যেকোন যুদ্ধ জয়ের জন্য শত্রুপক্ষকে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা আবশ্যক। দেশীয় জঙ্গি ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষের সাহায্য ছাড়া IS এর বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেক দুরূহ বিষয়। তাই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের আফগান সিরিয়াতে পরিণত হতে দেখতে না চাইলে শত্রুদের চিনতে শিখুন। আশেপাশের মানুষজনকে সচেতন করুন। হয়ত এখনও আমরা যুদ্ধটা হেরে যাইনি, হয়ত এখনও সময় আছে দেশটাকে জঙ্গিদের হাত থেকে বাঁচাবার।
— অন্যসময়
অন্যান্য সূত্রঃ
সাইট ইন্টেলিজেন্স এর সূত্র অনুযায়ী,