গুলশান হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক ও কাডানা প্রবাসী তামিম আহমেদ চৌধুরীর একজন আধ্যাত্মিক গুরুর সন্ধান পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তার নাম আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙ্গালী। সারাদেশে জঙ্গিদের দিয়ে কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকারী এই বাঙ্গালীকে খুঁজছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বাঙ্গালী দেশেই অবস্থান করছেন বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়েছে। তার ছবি ও বিস্তারিত পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।

গত ১০ জুলাই শাহআলী থানা এলাকা থেকে দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশের (ডিআইবি) মোস্তাফিজুর রহমান সিফাত, তাজুল ইসলাম, জিয়াবুল হক জিয়া, জাহিদ আনোয়ার পরাগ, নয়ন হোসেন ও জাহিদ হাসান মাইনকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান সিফাত ছিলেন দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশের (ডিআইবি) আইটি বিশেষজ্ঞ। আত-তামকীন নামে একটি ওয়েবসাইটে সংগঠনের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হয়। এই ওয়েবসাইটের এডমিনের দায়িত্ব পালন করেন সিফাত। গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে জিয়া-তামিমের আধ্যাত্মিক গুরু বাঙ্গালীর নাম তারা ফাঁস করে দেন। তারা জানান, দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশের আমীর হলেন আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙ্গালী।

গ্রেফতারকৃতরা জানান, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনাসহ ১১টি হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে এই আত-তামকীন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে।  হলি আর্টিজানের হামলার পরবর্তী এক সপ্তাহ পর্যন্ত হিযবুত তাহরীরের নেতা মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক ও আরেক নেতা তামিম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে তাদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান হতো। ঐ সব তথ্যই তারা ওয়েবসাইটে আপলোড করেন।

ওয়েবসাইটে তাদের এই তথ্য প্রচার করা হতো আধ্যাত্মিক গুরু আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙ্গালীর নামে। মূলত বাঙ্গালীই তাদের এই কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। বাঙ্গালীর সঙ্গে কথিত আন্তর্জাতিক সংগঠন আইএসের বার্তা সংস্থা ‘দাবিক’-এর যোগাযোগ হয়। দাবিক-এ প্রচারিত প্রতিদিনের তথ্য বাঙ্গালী বাংলা অনুবাদ করেন।

র্যাব এই ছয়জনকে গ্রেফতারের পর দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশের ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে অন্য আইডি দিয়ে তারা ওয়েবসাইটটি সচল রাখে। এ অবস্থায় অন্তত ১০ বার ঐ ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত আত-তামকীনের ওয়েবসাইটে আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙ্গালীর কথিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রকাশ হয়। তবে সেটি বুধবার সকাল থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘জিয়া-তামিমের আধ্যাত্মিক গুরু আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙ্গালী কিনা তা নিশ্চিত না হওয়া গেলেও ধারণা করা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির কার্যক্রম জিয়া-তামিমের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার সঙ্গে বাঙ্গালীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে হামলা চলাকালীন সেখান থেকে তথ্য ও ছবি বাইরে প্রকাশ করতে বাঙ্গালী প্রত্যক্ষ সহায়তা করেছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হিযবুত তাহরীর, জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ ও আনসার আল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশ কথিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছে। এ সব সংগঠন থেকে বেছে বেছে সদস্য নির্বাচন করা হয়েছে। প্রত্যেক সদস্যের নাম-পরিচয় গোপন রেখে ভুয়া পরিচয়ে তারা গ্রুপ গঠন করে। সংগঠনের নিয়ম হচ্ছে, কারো নামের বাইরে তার বাবা-মার পরিচয়, বাড়ির ঠিকানা এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিচয় সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন কেউ করতে পারবে না। এতে করে অপারেশন পরিচালনার সময় কেউ ধরা পড়লে গোয়েন্দারা তার কাছ থেকে কোনো তথ্য উদ্ধার করতে পারবেন না।

সূত্র আরো জানায়, আত্মগোপনে থেকে আবু ইউসুফ বাঙ্গালী তার দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে পুলিশ ও র্যাব বাঙ্গালীর অবস্থান শনাক্ত করেছিল। কিন্তু তিনি এতটাই কৌশলী যে বার বার তার অবস্থান পরিবর্তন করছেন। পুলিশ ও র্যাব তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।