ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কথিত বাংলাদেশ প্রধান শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফকে শনাক্ত করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)। ৮ অক্টোবর আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে নিহত ব্যক্তিই আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। তাৎক্ষণিকভাবে তার নাম আব্দুর রহমান বলে জানিয়েছিল র‌্যাব। র‌্যাব বলছে, গত ১৩ বছর ধরে সে জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।
ঘটনার পর আব্দুর রহমানের বাসা থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা, অস্ত্র-গোলাবারুদসহ সাংগঠনিক অনেক নথি উদ্ধার করা হয়। পরে তার পাসপোর্টের সূত্র ধরে প্রতীয়মান হয় যে আব্দুর রহমানের এ  পরিচয় ভুয়া  ।
এ ঘটনার ১২ দিন পর র‌্যাব দাবি করে, এই আব্দুর রহমানের প্রকৃত নাম সারোয়ার জাহান। তার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের থুমরিভোজা এলাকায়।
র‌্যাব কর্মকর্তাদের দাবি, আশুলিয়ার বাসা থেকে উদ্ধার করা নথিপত্র বিচার-বিশ্লেষণ করে আব্দুর রহমানকেই আইএসের কথিত বাংলাদেশ প্রধান আবু ইব্রাহিম আল হানিফ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ কাওরানবাজারে র‌্যাবের নতুন মিডিয়া অফিসে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘২০০৩ সালে এই আব্দুর রহমান  জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে পুলিশের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষ করেছিল। ওই সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং সে ৯ মাস ৪ দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পায়। এরপর দেড় মাস বাড়িতে থেকে ফের আত্মগোপনে চলে যায় সে। তার মানে প্রায় ১৩ বছর ধরে সে জঙ্গি  কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল।’
তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ সে নব্য জেএমবি গঠন করে এবং আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নামে এ সংগঠনের আমির হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ বিষয়ে কিছু নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। নিজেকে আমির হিসেবে ঘোষণার একটি কাগজে আবু ইব্রাহিম অর্থাৎ আব্দুর রহমান ও তামিম চৌধুরী স্বাক্ষর করে। শেখ আবু নামটি তামিম চৌধুরীর সাংগঠনিক নাম।’
চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল আইএসের কথিত মুখপত্র দাবিক-এর ১৪তম সংখ্যায় আবু ইব্রাহিম আল-হানিফের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকশিত  হয়। সেখানে তাকে বাংলাদেশে আইএসের কথিত প্রধান বলে দাবি করা হয়।
র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘এই আবু ইব্রাহিম ওরফে সারোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমান ১৯৯৮ সালের পর থেকেই জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। সে ইংরেজি, আরবি ও উর্দু ভাষায় কথা বলতে পারদর্শী।’
তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর জেএমবি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে নতুন ধারার ধর্মীয় উগ্রবাদের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পুরনো জেএমবি নব্য জেএমবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নব্য জেএমবি পরবর্তীতে সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পরিকল্পনা করে  এবং একই সঙ্গে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।’
বেনজির আহমেদ বলেন, ‘এক পর্যায়ে নব্য জেএমবির সাধারণ সদস্যরা  আব্দুর রহমানকে শূরা সদস্য হিসেবে মনোনীত করে। পরে অন্য শূরা সদস্যরা তাকে নব্য জেএমবির আমির হিসেবে ঘোষণা করে এবং তার সাংগঠনিক নাম দেয় শায়খ আবু ইব্রাহিম আল-হানিফ।’
র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, তারা আব্দুর রহমানের আশুলিয়ার আস্তানা থেকে একাধিক চিঠি, মেইল এবং খুদেবার্তা পেয়েছে। কয়েকটি চিঠিতে আব্দুর রহমান নিজেকে শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নাম ব্যবহার করে স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া , তার কাছ থেকে নব্য জেএমবির আমির হিসেবে জঙ্গিবাদে ব্যবহৃত অর্থ লেনদেনের কিছু হিসাবও পাওয়া গেছে। এসব নথিপত্র পর্যালোচনা করেই তারা নিশ্চিত হয়েছে যে, আব্দুর রহমানই আবু ইব্রাহিম ‘
র‌্যাব সূত্র জানায়, আবু ইব্রাহিমের নির্দেশে নব্য জেএমবির সদস্যরা ‘ইনগিমাস বা গুপ্ত হামলা’ শুরু করে। গত বছরের ৩০ আগস্ট চট্টগ্রামে মিরেরসরাইয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ইমরানকে গুলি করে ৬০ লাখ টাকা ছিনতাই করে নেয়। ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের বাংলাবাজারে তারা নেংটা বাবা ও তার এক সহযোগীকে হত্যা করে। মূলত এ দুটি অপারেশন সফলভাবে পরিচালিত হওয়ায় আব্দুর রহমানকে নব্য জেএমবির শূরা সদস্যরা বাংলাদেশের নব্য জেএমবিতে বায়াত দেওয়ার জন্য অনুমতি দেয়।
র‌্যাব সূত্র আরও জানায়, উদ্ধারকৃত নথিপত্রে নব্য জেএমবির সদস্যরা বাংলাদেশে দাওয়াত, ইলেম ও তাসকীয়া, ইয়ানত, ইদাদ গ্রুপ, রিবাহ্ এবং কিসাক/ফিতনা নিরোধন ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতো বলে জানা গেছে।
প্রথম দুই সফল অপারেশনের পর আব্দুর রহমানের নির্দেশক্রমে নব্য জেএমবির সদস্যরা বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। বিশেষ করে গুলশান, বনানী, বারিধারায় বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। এছাড়া,  মন্দির, হোসনি দালান, শিয়া মসজিদসহ তাদের ভাষায় তাগুতের সৈনিক র‌্যাব, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী এবং ব্লগার নাস্তিকদের যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই আক্রমণের পরিকল্পনা করে।