এ বছর শোকের মাস আগস্টের শুরু হয়েছিল ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খালিদ সাইফুল্লাহর করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আগস্ট মাসের সূচনালগ্নে রাত ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্বলনের কর্মসূচি শেষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সাইফুল্লাহ। ঘটনাটি মর্মান্তিক, দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। ছাত্রলীগ নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বলে দাবি করে। অথচ বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচি পালন কেন্দ্র করে একজন ছাত্রকে জীবন দিতে হল ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতেই!

সাইফুল্লাহ হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কি আইনের আওতায় আনা হবে, শাস্তি দেওয়া হবে? নাকি অনেক হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে? সাইফুল্লাহর বাবা-মা কীভাবে তাদের বুকের মানিক হারানোর বেদনা ভুলে থাকবেন?

ছাত্রলীগ বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। শুধুু নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি-হানাহানি নয়, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি-বাণিজ্য, অপহরণ, শিক্ষক-লাঞ্ছনাসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে তাদের কর্মীদের নাম আসছে। গত সাড়ে সাত বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৫ শিক্ষার্থী, ভাবা যায়? তরুণ প্রাণের কী করুণ অপচয়!

কোনোভাবেই ছাত্রলীগকে নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন বাংলাদেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, এটাই তাঁর স্বপ্ন ও সাধনা। কিন্তু তাঁর সমর্থক হিসেবে পরিচয়দানকারী কতিপয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ঠিক উল্টো কাজ করে যাচ্ছে। তাদের অপরাধ যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাফল্যের পালকটি অনুজ্জ্বল করে তুলছে সেটা বোঝার মতো কাণ্ডজ্ঞানও তাদের নেই।

বিস্ময়ের বিষয় হল, যাদের কারণে সরকারের সুনামহানি হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে কেন যেন অনীহা লক্ষ্য করা যায়। সরকারের যারা শুভানুধ্যায়ী তারা সরকার-সমর্থক হিসেবে পরিচিত বেপরোয়া কর্মীদের লাগাম টেনে ধরার দাবি জানিয়ে এলেও বাস্তবে দেথা যাচ্ছে, তাদের লাগামহীন অপকর্ম থামছে না। আগস্ট মাস যেহেতু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হারানোর বেদনাবিধুর সময়, সেহেতু এ মাসে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা অন্তত সংযম ও শিষ্টাচারের সীমা কোনোভাবেই লঙ্ঘন করবে না, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু আমরা দেখছি এ মাসেও অপরাধমূলক কাজ থেকে ছাত্রলীগের অনেকে বিরত থাকছে না।

মাসের শুরুর দিনে কুমিল্লায় ছাত্র-হত্যার ঘটনার পর ১৩ তারিখেই ঢাকায় আর একটি অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে ছাত্রলীগের নাম জড়িয়েছে। তেজগাঁও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান রবীন ও তার সহযোগীরা রাজধানীর মিরপুরের সাইক ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলোজির স্থাপত্য বিদ্যার চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা ফেরদৌসের মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের একটি নিভৃত গ্রাম থেকে আফসানা ঢাকায় এসেছিলেন শিক্ষার আলোয় নিজে আলোকিত হয়ে দেশকেও আলোকিত করার আবেগময় স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তাকে অকালেই লাশ হয়ে ফিরে যেতে হল তার স্বজনদের কাছে।

১৩ আগস্ট বিকেলে মিরপুরে আল হেলাল হাসপাতালে আফসানাকে ফেলে রেখে যায় দুই যুবক। চিকিৎসকরা তাকে মৃত অবস্থায় পেয়েছেন। আফসানার পরিবারকে অজ্ঞাত টেলিফোন নম্বর থেকে তার সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে নাজেহাল করা হয়েছে। এক পর্যায়ে স্বজনরা আল হেলাল হাসপাতাল থেকে আফসানার মৃতদেহ উদ্ধার করেন।

আফসানার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মেয়েটিকে হত্যা করেই ঘাতকরা তার মৃতদেহ হাসপাতালে রেখে গেছে। তাদের ধারণা, এই হত্যার পিছনে ছাত্রলীগ নেতা রবীন ও তার বন্ধুরা জড়িত। কারণ যে সব টেলিফোন নম্বর থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে সেগুলো রবীনের বন্ধুদের নম্বর। তাছাড়া টেলিফোনে আফসানার স্বজনদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি কইরেন না। একটা মিসটেক হয়ে গেছে। আসেন, আমরা বসে মীমাংসা করে ফেলি।’

শোনা যাচ্ছে, আফসানার সঙ্গে রবীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তারা যে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত, সেখানে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। অনুমান করা হচ্ছে, কোনো কারণে তাদের এই বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছিল এবং তার পরিণতি হিসেবেই আফসানাকে জীবন দিতে হল।

আফসানা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন। কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে, তিনি মোটামুটি সমাজ-সচেতন ছিলেন। তারপরও একজন ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে কীভাবে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে গেলেন সেটা কিছুটা রহস্যজনক বৈকি! শুরু থেকেই আফসানার ঘটনাটি হত্যা না আত্মহত্যা তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। তার পরিবারের ধারণা, তিনি কোনোভাবেই আত্মহত্যা করতে পারেন না, তাকে হত্যা করা হযেছে। আর এই হত্যার জন্য তারা রবীনকেই দায়ী করছেন।

রবীনের সঙ্গে আফসানার বন্ধুত্বের বিষয়টি পরিবারের জানা ছিল বলে মনে হয়। ঘটনার পর থেকেই রবীনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশও তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। ঘটনার সঙ্গে যদি কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা না-ই থাকবে তার তাহলে সে লাপাত্তা হবে কেন? তার বন্ধুরাই-বা কেন আফসানার পরিবারকে হুমকি-ধামকি দিবে?

আফসানা কি আত্মহত্যা করেছেন? ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক ঘটনাটি ‘আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা’ বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্য আফসানার পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, আফসানাকে হত্যা করেই হাসপাতালে ফেলে রেখে গেছে খুনিরা। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে, মেয়েটি আত্মহত্যা করেছেন, তাহলে প্রশ্ন আসে, তিনি কেন আত্মহত্যা করলেন? কে তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করল?

আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়াও আইনত অপরাধ। কাজেই যে বা যারা তাকে হত্যা করেছে অথবা আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে সে বা তারা কোনোভাবেই রেহাই পেতে পারে না। রবীন ও তার বন্ধুরা বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই যেভাবে লুকোচুরি খেলছে তাতে সব সন্দেহের চোখ স্বাভাবিকভাবে তাদের উপর পড়ছে। তাদের গ্রেপ্তার করা ও আইনের আওতায় আনা জরুরি কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রবীন ছাত্রলীগের নেতা হওয়ায় আইনের উর্দ্ধে যাওয়ার অধিকার অর্জন করেনি। তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে তাকে বিচার না করে দেখতে হবে তার দ্বারা প্রকৃতপক্ষে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না সেটি। রবীনের বিরুদ্ধে যেহেতু খুনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সেহেতু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত হবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা।

সরকারি দলের আশ্রয়–প্রশ্রয়ে অপরাধ করার যে প্রবণতা ইদানিং দেখা যাচ্ছে রবীনের ক্ষেত্রে যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আইন সবার জন্য সমান, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সবারই আছে– এটা যেন কেবল কথার কথা না হয়ে সত্য হয়।

গত কয়েক মাসে আলোচিত অন্তত আরও দুটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। মার্চ মাসের ২০ তারিখে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভিতরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী, নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। সেনানিবাসের মতো একটি নিরাপদ স্থানে তনুকে কে বা কারা হত্যা করল তা এখনও বের করা সম্ভব হয়নি। তনু হত্যার ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ-মানববন্ধন অনেক কিছুই হয়েছে। তনুর বাবা-মা সম্ভাব্য হত্যাকারী কে বা কারা হতে পারে সে সম্পর্কে প্রকাশ্যেই কথা বলেছেন। কিন্তু তাদের সম্ভবত জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি!

তনু হত্যার বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার একটি প্রয়াস প্রথম থেকেই লক্ষ্য করা গেছে। হত্যাকারীদের আড়াল করার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তনুর লাশের ময়না তদন্ত নিয়েও টালবাহানা করা হয়েছে। হত্যার আগে তনু ধর্ষণের শিকার হলেও প্রথম রিপোর্টে তা বেমালুম অস্বীকার করা হয়েছিল। দিন যত যাচ্ছে, ততই তনুর বাবা-মাসহ বিচারপ্রত্যাশী সব মানুষ মনে করতে শুরু করেছেন যে, তনুর ঘাতকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে।

গত ৫ জুন চট্রগ্রামে নিহত হয়েছেন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু। বাবুল আক্তার ধর্মান্ধ জঙ্গি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একাধিক সাহসী অভিষান পরিচালনা করেছিলেন। প্রথমে বলা হয়েছিল যে, বাবুল আক্তারের প্রতি কোনো কোনো আক্রোশ থাকায় প্রতিহিংসার বলি হয়েছেন তার স্ত্রী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। তদন্ত শুরু হলে মিতু হত্যার জন্য তার স্বামীর দিকেও সন্দেহের চোখ যায়।

২৪ জুন রাতে বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দারা ধরে নিয়ে যান। এরপর মিতু হত্যার তদন্তের আর কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া না গেলেও, মিতুর স্বামী বাবুলের চাকরি থাকা না-থাকা নিয়ে অনেক খবর গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ হয়েছে। বাবুল স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন বলে জানানো হলেও তিনি নিজে বলেছেন তিনি পদত্যাগ করেননি। এই নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেশের মানুষ জানতে পারছেন।

স্ত্রী-হত্যার জন্য বাবুল যদি দায়ী হয়ে থাকেন তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে কেন সে প্রশ্ন অনেকের মনে দেখা দিয়েছে। তিনি একজন চৌকস পুলিশ কর্মকতা। পরপর তিনবার পদক পাওয়া গৌরবের অধিকারী বাবুলের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক অপতৎপরতা যেমন মেনে নেওয়া যায় না, তেমনি স্ত্রী-হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ যদি থাকে তাহলে তাকে রেহাই দেওয়াও চলবে না।

লঘুপাপে গুরুদণ্ড অথবা গুরুপাপে লঘুদণ্ড কোনোটাই দেশের মানুষের কাছে প্রত্যাশিত নয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ এগিয়ে নিয়ে বিচারহীনতার যে অপসংস্কৃতি চালু হয়েছিল তা থেকে দেশকে মুক্ত করার এক অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দেশের মানুষ আশা করে এই সরকারের সময়কালে কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ডই বিচারের আওতার বাইরে থাকবে না। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ঘটনা ঘটছে জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে।

তনু, মিতু, ও আফসানার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের যদি চিহিৃত করা না যায়, প্রকৃত অপরাধীদের যদি আইনের আওতায় আনা না হয়, যদি তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তাহলে দেশের ন্যায়বিচার বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতির দাবি কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না।