ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ৩০ অক্টোবরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙচুর লুটপাট করা হয়েছে এবং পনেরটি মন্দির ভাঙা হয়েছে। এক কথায় তাণ্ডব চালানো হয়েছে। কালীপূজা এবং ভাতৃ-দ্বিতীয়ার উৎসবের আমেজের মধ্যে এই আসুরিক ঘটনা যে ঘটানো হল তা নিয়ে গণমাধ্যম যে খুব বেশি সোচ্চার হয়েছে তা-ও নয়।

রামুর ঘটনার মতেই এখানে পরিকল্পিতভাবে ফেসবুকের একটা ছবি কেন্দ্র করে এই ঘটনা সাজানো হয়েছে। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, ফেসবুকে কেউ একজন একটি আপত্তিকর ছবি পোস্ট করেছে, তাহলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর লুটপাট করতে হবে কেন?

কেউ যদি ফেসবুকের মাধ্যমে কোনো আপত্তিকর কিছু লিখে থাকে বা ছবি দেয় তাহলে সেটার বিচার হবে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে। বাড়িঘর লুটপাট, ভাঙচুর হবে কোন যুক্তিতে? যারা এই লুটপাট চালিয়েছে তারা কি মুসলমান? যদি সত্যিই তারা মুসলমান হত তাহলে তো তাদের জানার কথা যে বিদায় হজের ভাষণে হযরত মুহম্মদ(স.) স্পষ্ট বলেছেন যে, একজনের অপরাধে সেই ব্যক্তির পুরো সম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।

অন্যত্র হাদিসে রয়েছে, যুদ্ধরত নয় এমন বিধর্মীদের কোনো ক্ষতি করা চলবে না। বরং শান্তিপ্রিয় বিধর্মীকে নিরাপদে তার ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব একজন মুসলমানের উপরেই বর্তায়।

তবে এত কথা বলে কোনো লাভ নেই। কারণ ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’। ‘আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত’ নামে উগ্রবাদী ধর্মীয় শ্লোগান দিয়ে যারা নাসিরনগরে এই হামলা ও তাণ্ডব চালিয়েছে তারা ধর্মীয় লেবাসধারী শয়তান ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ধরনের উগ্রবাদী দলগুলো নিজেদের ইসলামের রক্ষক বলে প্রচার করলেও ধর্মের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানোই তাদের আসল কাজ। এদের মতো অমানুষদের কারণেই অন্য ধর্মের মানুষরা ইসলাম শব্দটি শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এরাই ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে এবং ধর্মের শান্তিপূর্ণ ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে। এরাই ‘ফ্যাসাদ’ সৃষ্টিকারী। তারা ধর্ম, মানবিকতা, আইন কিছুই মানে না। তারা জানে লুটপাট করে খুব সহজেই পার পাওয়া যাবে। কোনো একটা ছুতায় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা চালিয়ে তাদের উপর লুটপাট চালানোই তাদের আসল উদ্দেশ্য। হয়তো ভয় দেখিয়ে ও হামলা চালিয়ে সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ করে তাদের জমি দখল করাও আসল উদ্দেশ্য।

কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। যারা হামলা চালিয়েছে তারা সংখ্যায় কত জন আর নাসিরনগরে হামলাকারী ছাড়া মুসলমান কত জন? একদল গুণ্ডা ধর্মের নাম দিয়ে হামলা চালাচ্ছে তাহলে অন্যরা কেন এগিয়ে আসেনি হিন্দুদের রক্ষা করতে? একদল দুষ্কৃতিকারী যদি ইসলামের অবমাননা করে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা চালায় তাহলে অন্য মুসলমানদের কি কর্তব্য ছিল না ধর্মের ইমেজ বাঁচাতে এগিয়ে আসা?

এই প্রসঙ্গে এই দেশেরই একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি। ১৯৫০ সালে যখন পাকিস্তান সরকারের উস্কানিতে এদেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে বিতাড়িত এবং তাদের সম্পত্তি দখল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয় তখন চকবাজারের শাহী জুমা মসজিদে জুমার নামাজের বিশাল সমাবেশে জ্ঞানতাপস ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একটি ভাষণ দেন। তিনি বলেন, “যদি কেউ ধর্মগ্রন্থ থেকে প্রমাণ করতে পারে যে শান্তিপ্রিয় বিধর্মীদের উপর হামলা করার নির্দেশ রয়েছে তাহলে আমি আমার নাম পালটে ফেলব। আমি আমার বাড়িতে হিন্দুদের আশ্রয় দিচ্ছি, আমার বাড়িতে আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছি, কারও যদি সাহস থাকে তো পারলে এসে হামলা কর। আপনারা যদি নিজেকে প্রকৃত মুসলমান বলে মনে করেন তাহলে নিজের নিজের বাড়িতে হিন্দুদের আশ্রয় দিন এবং দাঙ্গাকারীদের প্রতিহত করুন, হিন্দুদের জান-মাল রক্ষা করুন।”

তাঁর এই সাহসী বক্তব্যের পর চকবাজার এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ হয়ে যায়।

যদি সেদিন নাসির নগরে একজনও সাহসী মানুষ এমনভাবে এগিয়ে আসতে পারতেন তাহলে এই হামলাকারীরা পালাতে পথ পেত না। আমাদের গোটা সমাজেই পচন ধরেছে। আমরা মুখে আজকাল যতই প্রগতিশীল সাজি না কেন ভিতরে ভিতরে কাপুরুষ ও সুবিধাবাদী। কেন সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হলে তাদের সম্প্রদায়ের মানুষেই প্রতিবাদ করতে হয়? কেন সংখ্যাগুরুরা তাদের পক্ষে মাঠে নামেন না? দাঙ্গাকারী হামলাকারী গুণ্ডা থাকে কত জন আর হামলাকারী নয় এমন মানুষ কত? নিশ্চয়ই হামলাকারীর সংখ্যা তুলনামুলকভাবে কম। তাহলে যারা চোখের সামনে এমন নির্যাতন হতে দেখে তারা কেন এগিয়ে আসে না তা প্রতিরোধে?

মন্দির ভাঙচুর, প্রতিমা ভাঙচুর করে কীভাবে এই দুস্কৃতিকারীরা পার পায়? এসব ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক সাজা কেন হয় না? পাহাড়ি ও সমতলবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের জায়গা-জমি দখল, তাদের বসতি থেকে উচ্ছেদ চলছেই। তাদের উপর চলছে নির্যাতন, ধর্ষণ, খুন, গুম, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা। এগুলোর যেন কোনো বিচার নেই, প্রতিকার নেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, মন্দির ভাঙচুরও চলছেই। এরও প্রতিকার নেই।

এই ধরনের প্রশ্ন উঠলেই কতিপয় শিয়ালপণ্ডিত আবার ভারতের তুলনা নিয়ে আসে। এই সুবিধাবাদী শিয়ালদের বলি, ওরে, এটা বাংলাদেশ। এটা ভারত নয়। আমরা আমাদের সংবিধান অনুযায়ী চলব। ভারতে কী হয় না হয়, ইউরোপে কী হয় না হয়, আমেরিকায় কেমন চলে সে প্রশ্ন অবান্তর। বাংলাদেশে কী হয় সেটা আগে চোখ মেলে দেখ, সেটার বিচার কর, তারপর অন্য দেশের উদাহরণ টেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, প্রশাসন এ ক্ষেত্রে কী করছে? যখনই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে তখনই ১৪৪ ধারা জারি করা হয় না কেন? নাসিরনগরে যখন উগ্র লোকজন সমাবেশ ও মিছিল করতে যাচ্ছে তখনই যদি প্রশাসন তৎপর হত, দ্রুত ব্যবস্থা নিত তাহলে তো আর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে পারত না।

বিশ্ব পরিস্থিতি, আইএস, দেশি জঙ্গিদের অশুভ তৎপরতা এসব মিলিয়ে এমনিতেই অবস্থা নাজুক। এখন যে কোনো মূল্যে বাংলাদেশের সামাজিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।

বাউল-বৈষ্ণব, সুফি, দরবেশের এই জনপদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠ এখানে পাশাপাশিই অবস্থান করে। জঙ্গীবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এদেশে বিষাক্ত ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়েছে বিগত কয়েক বছরে। এটাই অপসংস্কৃতি। এর মোকাবেলায় আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ প্রয়োজন। পাড়ায় মহল্লায় আগের মতো সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অসাম্প্রদায়িক দেশীয় সংস্কৃতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাহলেই এমন উগ্রবাদী অপরাধীরা পরাজিত হবে।

এই উগ্রবাদী, ধর্মের লেবাশধারী দাঙ্গাকারীদের উদ্দেশ্যে রয়েছে একটাই কথা– তোরা ‘বাংলা ছাড়’।