গণঅভ্যুত্থানের মুখে সামরিক শাসক এরশাদের পতনের ২৬তম বার্ষিকী আজ। কিছুদিনে আগেই ২৭ নভেম্বর ২৬তম শহীদ ডা. মিলন দিবস পালিত হল। ২৭ নভেম্বর দিনটি জাসদ ও শহীদ ডা. মিলন সংসদ গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবেও পালন করে। কারণ এরশাদের পতন নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বরেই। মিলনকে হত্যা করে এরশাদ ভেবেছিলেন, মিলন হত্যার দায় ছাত্রদের সশস্ত্র সংঘর্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ছাত্র ঐক্যের আন্দোলন কালিমালিপ্ত করা যাবে, আন্দোলন বিভক্ত করা যাবে, সর্বোপরি নতুন করে জরুরি আইন জারি করে আন্দোলনকে অতীতের মতো আবার থামিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু হল উল্টোটা!

মিলনকে হত্যা করার মুহূর্ত থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, আন্দোলন দমিয়ে দেবার জন্যই তাঁকে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। তাই জনগণ এরশাদকে চূড়ান্ত বিদায় দেবার জন্যই নেমে পড়ে রাজপথে, সংঘটিত হয় গণঅভ্যুত্থান। এরশাদের পতন নিশ্চিত হয়। এরপর এরশাদ সান্ধ্য আইন, জরুরি আইন ইত্যাদি দিয়ে ক্ষমতা দীর্ঘায়ু করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, এরশাদের বিদায় অনুষ্ঠানটা কীভাবে মঞ্চস্থ হবে, অর্থাৎ ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে।

ঠিক একইভাবে ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারির গণঅভ্যুত্থানেই পাকিস্তানের সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইউব খানের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায়। বাকি দিনগুলোতে পরিকল্পনা করা হচ্ছিল ক্ষমতার শূন্যস্থান কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে দেন-দরবার। আইউব বিদায় নেয় ২৫ মার্চ ১৯৬৯ তারিখে ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। কিন্তু আইউবের পতন দিবস হিসেবে ২৪ জানুয়ারি পালন করা হয় গণঅভ্যুত্থান দিবস। ঠিক তেমনি এরশাদ পতনের গণঅভ্যুত্থান দিবস ২৭ নভেম্বর।

মিলনের আত্মদানের মধ্য দিয়ে দেশ থেকে সামরিক শাসন বিদায় নিয়েছে, সংসদীয় সরকার পদ্ধতি ফিরে এসেছে। কিন্তু মিলন ও অন্যান্য শহীদদের স্বপ্ন কি আমরা পূরণ করতে পেরেছি? মিলনরা কি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য জীবন দিয়েছেন? গণতন্ত্রের অন্যান্য অনুসঙ্গগুলো পূরণ না করার ফলে সে ব্যবস্থাটাও তো আজ হুমকির সম্মুখীন!

মিলন ও তার সমআদর্শের সাথীরা একটা সুনির্দিষ্ট আদর্শের জন্যই দীর্ঘ লড়াই করেছে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, জীবন দিতেও পিছপা হয়নি। স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ যেখানে আছে তার থেকে সামনে এগিয়ে যাবে, গণতন্ত্র ও প্রগতির যাত্রা পেছন দিকে যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই শুরুর দিকে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব জয় করে মিলন ও তার সহযোদ্ধারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন; তাকে ইস্পাতদৃঢ় করেছে ও চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অবিচল থেকেছেন।

যে তাত্ত্বিক যুক্তি মিলনদেরকে জীবন দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তা খুঁজে দেখা যাক। মিলন জাসদ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জাসদের যে অংশ ১৫ দলীয় ও পরে ৫ দলীয় ঐক্যজোটের শরীক ছিল, সে অংশের সঙ্গে একাত্ম ছিলেন। জাসদ জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১০দলীয় ঐক্যজোটে সামিল হয়, যেখানে আওয়ামী লীগ, সিপিবিসহ আরও ৯টি দল যুক্ত ছিল। ১৯৭২-৭৫য়ে সরকারে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের (যে দল থেকে বেরিয়ে এসে জাসদ গঠিত হয়) সঙ্গে ঐক্য করে কীভাবে সমাজতন্ত্র কায়েম হবে, গণতন্ত্র আবার বাকশালে বন্দি হবে কি না ইত্যাদি নানা প্রশ্ন ওঠে জাসদ তথা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলোর ভেতরে ও বাইরে। ঐক্যের প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ করে জাসদ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নেতৃবৃন্দের একাংশ ১৯৮০ সালে বাসদ গঠন করেন।

[অবশ্য তিন বছর বাদেই এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ১৫ দলের শরীক হয় জাসদ, বাসদ উভয়ই।]

পাঁচ বছর পরে আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধিতা করে ১৯৮৫ সালে এরশাদের গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের জন্য জাসদ থেকে নেতৃত্বের অপর একাংশ বেরিয়ে গিয়ে পৃথক জাসদ গঠন করেন।

যাহোক, ১৯৮০ সালে সিরাজুল আলম খানসহ জাসদের শীর্ষ ১২ নেতা গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিশেষ করে আওয়ামী লীগসহ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সম্পর্ক ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় নিয়ে ‘কর্মসূচী-সংগঠন-আন্দোলন প্রসঙ্গে সমন্বয় কমিটির তাত্বিক বিশ্লেষণ’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ছিলেন, মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) এম এ জলিল, আ স ম আবদুর রব, মোহাম্মদ শাজাহান, রুহুল আমিন ভুঁইয়া, খন্দকার আবদুল মালেক শহীদুল্লা, হাসানুল হক ইনু, মুনির উদ্দিন আহমেদ, আবুল হাসিব খান, শাজাহান সিরাজ, মির্জা সুলতান রাজা ও নূর আলম জিকু। এ পুস্তিকার মূল কথা ছিল: আপোষহীন গণতান্ত্রিক সংগ্রাম বিপ্লবের পথ করে দেবে। আলোচনার সুবিধার্থে ঐ পুস্তিকা থেকে বেশ কিছু উদ্ধৃতি দেব।

সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে জাসদ কীভাবে দেখেছে? ‘তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ বলে:

“… আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক শক্তি ভিত গড়ে তোলার সমস্যা মূলত একই সমস্যার দুটি দিক মাত্র, যাকে কেন্দ্র করে প্রতিটি আন্দোলন রচনা করতে হবে। এই তিন সমস্যা কেন্দ্র করে যে আন্দোলন পরিচালিত হয় তা হল বিপ্লবী গণতান্ত্রিক।”

[পৃ. ২০]

”সর্বহারা শ্রেণিকে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক স্তরে ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের সমস্যাটি মোকাবেলা করতে হয়। এই ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ঘায়েল ও কাবু করার জন্য দরকার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। সেই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের উপর গড়ে উঠা ঐক্যফ্রন্ট হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির আরেকটি মোক্ষম হাতিয়ার। সর্বহারা শ্রেণির অংশগ্রহণে সেই ঐক্যফ্রন্ট বলিষ্ঠ ও জীবন্ত হয়। ঐক্যফ্রন্টের বলিষ্ঠ ভূমিকা ক্ষমতাসীন স্বৈরতান্ত্রিক বুর্জোয়া গোষ্ঠীকে ব্যাপক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, দুর্বল করে এবং সর্বহারা শ্রেণির বিজয়ের পথ সুগম করে।”

[পৃ. ২৮]

জাসদ ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপোষহীনতাকে যেভাবে দেখেছে:

“উদারনৈতিক বুর্জোয়া, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও সংশোধনবাদীরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কখনও কখনও গরম গরম কথাবার্তা বললেও শ্রেণি সহযোগিতার ধারাবাহিক এক রাজনীতির গদকে সাধারণত অতিক্রম করতে পারে না। ফ্যাসিবাদের আক্রমণে কখনও কোনঠাসা হয়ে পড়লে অথবা আন্দোলনের উপযোগী পরিস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ জনতার লেজুড়বৃত্তি করে আন্দোলনে নামলেও সামগ্রিক গণসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বুর্জোয়াকে মোকাবেলা করার পথ সাধারণত তারা অনুসরণ করে না।”

“… ঐক্যফ্রন্ট সর্বহারা শ্রেণির শক্তি ভিত রচনার প্রশ্নে যেমন কিছুটা হলেও সহায়তা করবে তেমন শত্রু শিবিরকে বন্ধুহীন ও দুর্বল করে রাখবে। … পেটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তির উপর বেশি আশা করা অনুচিত হবে। এ অতি আশা করলে বুর্জোয়া চৌহদ্দি কখনও অতিক্রম করা যাবে না। একমাত্র বিপ্লবী গণতন্ত্র অনুশীলনের মধ্য দিয়ে কার্যকরী ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলা যায় এবং বুর্জোয়া চৌহদ্দি অতিক্রম করা যায়।”

[পৃ. ৩২-৩৩]

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ বা যুগপৎ আন্দোলনের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে জাসদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যা বলেছে:

“… তাই গণতন্ত্রের মুখোশপরা কোনো স্বৈরাচারী শক্তিও যদি সে কর্মসূচী স্বীকার করে নিয়ে আন্দোলনে শরীক হয় তাহলে সে আন্দোলন স্বৈরাচারের নয়, গণতান্ত্রিক শক্তিরই শক্তিভিত জোরদার করে তোলে। এটা গণতান্ত্রিক শক্তিরই বিজয় এবং স্বৈরাচারী শক্তির পরাজয় এর লক্ষণই বহন করে। তাই বিভিন্ন বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া দলগুলোর আপোষকামিতা ও স্বৈরাচারী প্রবণতা আটকে ফেলতে হবে একটার পর একটা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের বেড়াজালে। কেবল তখনই একটা কার্যকরী ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে।”

[পৃ. ৩৫]

ডা. মিলনের বিচরণক্ষেত্র ছিল পেশাজীবীদের আন্দোলনে। শ্রমজীবী-পেশাজীবীদের আন্দোলনকে জাসদ চিত্রিত করেছে ‘বিশেষ আন্দোলন’ হিসেবে, আর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনকে বলা হয়েছে ‘সাধারণ আন্দোলন’।

“আজকের (১৯৮০ সাল) অবস্থায় সাধারণ আন্দোলন হল ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বিশেষ আন্দোলন হল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অভ্যন্তরে সুস্পষ্টভাবে গড়ে ওঠা পুঁজিবাদবিরোধী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তিভিত যা শিল্প শ্রমিক ও খেত-মজুরদের আন্দোলনে এই মুহূর্তে অনেকাংশে প্রতিভাত হবে।”

[পৃ. ২৫]

শ্রমজীবী-পেশাজীবীদেরকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যা বলেছে:

“পুঁজিবাদ তথা ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে তার চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে হলে দরকার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের, দরকার সেই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্যেই বিশেষ আন্দোলন করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই একটার পর একটা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন রচনা করতে হবে, গড়ে তুলতে হবে ইস্যুভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহের ঐক্য এবং নিম্নতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও কার্যকরী এক ঐক্যফ্রন্ট।”

[পৃ. ৩৬]

“… পেশাজীবীদের প্রতিনিধিসহ স্বশাসিত ‘গ্রাম সরকার’ গড়ে তুলতে হবে, গড়ে তুলতে হবে অনুরূপভাবে পৌর এলাকায়, শিল্পাঞ্চলে, সরকারি-আধাসরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে স্বশাসিত সংস্থা। এই সব স্বশাসিত সংস্থাসমূহের প্রতিনিধিদের নিয়ে গড়ে তুলতে হবে ‘কেন্দ্রীয় সংস্থা’। এই ‘কেন্দ্রীয় সংস্থা’ শ্রমজীবী জনগণের দাবি-দাওয়া তুলে ধরার আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠবে যা দেশের শ্রমজীবী মানুষের কার্যনির্বাহক শক্তি হিসাবে কাজ করবে।”

“… ভেবে দেখুন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই সংস্থাসমূহ আজ অথবা কাল যদি গড়ে তোলা হয়, বা গড়ে তোলার পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যায়, তাহলে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত সর্বহারা ও আধা-সর্বহারা সচেতন ও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেল কি না? এইসব স্বশাসিত সংস্থাসমূহসহ ‘কেন্দ্রীয় সংস্থা’ গঠনের আন্দোলন শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত হওয়ার এক বিরাট সুযোগ করে দিবে।”

“… স্বশাসিত সংস্থাসহ ‘কেন্দ্রীয় সংস্থা’ শ্রমজীবী মানুষের শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থই নয়, তার রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনের একটি উত্তম কার্যকরী হাতিয়ার।”

[পৃ. ৪৬]

তাই মিলনের মতো বিপ্লবী সংগঠকগণ শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবীদের আন্দোলনকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ধারার আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে প্রাণপাত করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শাজাহান সিরাজ শ্রমিকদের হরতালে পিকেটিং করতে গিয়ে রক্ত দিয়েছে এ স্বপ্ন নিয়ে। লক্ষ্য ছিল শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবীদের একটা বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ শক্তি গড়ে তোলা।

১৯৮৬ সালে যখন সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতির সভাপতি এডভোকেট শামসুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘সম্মিলিত পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়, সে রকম একটি ‘কেন্দ্রীয় সংস্থা’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা মিলন ও তার সাথীরা দেখেছিলেন। ১৯৮৬ সালে ভেঙ্গে যাওয়া রাজনৈতিক জোটসমূহকে আবার ঐক্যবদ্ধ করার ভূমিকা নেয় ‘সম্মিলিত পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ’ ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উভয় অংশ। লক্ষ্য আপোষহীন দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলা, যা ১৯৮৭ সালে ঢাকা অবরোধ ও নূর হোসেনের সাহসী আত্মদানের মধ্য দিয়ে মহিমান্বিত হয়ে ওঠে।

আন্দোলনকে আপোষহীন ও মারমুখী করবার পেছনেও তাত্ত্বিক যুক্তি ছিল:

“বুর্জোয়া ব্যবস্থার বিধিসমূহ ব্যবহার করে আন্দোলনের বিকাশ ঘটানোর সময় আন্দোলন তার বিপ্লবী চরিত্র হারায় না, কারণ রাজনৈতিক কর্মসূচী ও আন্দোলনে বিপ্লবী উপাদানটি বর্তমান থাকে। রাজনৈতিক কর্মসূচী দিয়েই প্রধানত আন্দোলনের চরিত্র নির্ধারিত হলেও আন্দোলনে মারমুখী জঙ্গি জনতার উপস্থিতি আছে কি না এবং সেই সাথে তার গতিপ্রকৃতিও চরিত্র নির্ধারণের প্রশ্নে একটি অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে।”

[পৃ. ২১]

১৫ দলের ২১ দফা কর্মসূচী, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১০ দফা, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) ৫ দফাতে বিপ্লবী উপাদান সংযুক্ত করেছিলেন জাসদসহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক সংগঠনসমূহ। এর পাশাপাশি আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ, বিএমএ, শিক্ষকদের আন্দোলন; প্রকৌশলী-কৃষিবিদ-চিকিৎসকদের (প্রকৃচি) প্রশাসনের গণতন্ত্রায়নের দাবি তো ছিলই। তাই সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবী উপাদান রয়েছে এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন মিলন ও তার সাথীরা।

এরশাদের পতন গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই হতে হবে এ ধরনের একটা প্রতিজ্ঞা ছিল জাসদ ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ৫ দলীয় ঐক্যজোটের। তাই জনগণের ক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যাওয়াতেই তাদের সচেতন প্রয়াস ছিল। ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি, ২২-২৩ ডিসেম্বর শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) টানা ৪৮ ঘণ্টা দেশব্যাপী হরতাল, ১০ নভেম্বর ১৯৮৭ থেকে টানা ঢাকা অবরোধ এবং সর্বশেষ ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ডের পরে সফল গণঅভ্যুত্থান– এ সবই ছিল জাসদ ও সমাজতন্ত্রীদের সচেতন প্রয়াসের ফল। এ প্রসঙ্গে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলে:

“আর এই পুঁজিবাদী সমাজে ক্ষমতা দখলের জন্য আন্দোলনের রূপ যেহেতু অভ্যুত্থানধর্মী হতে বাধ্য, সেহেতু সংগঠন ও আন্দোলনকে তার সঙ্গে তাল রেখেই পা ফেলতে হবে।”

[পৃ. ২৩]

দীর্ঘ প্রায় নয় বছরের আন্দোলন তিল তিল করে গড়ে তোলা, তাকে আপোষহীনভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, ঐক্য ধরে রাখা, আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে তাকে মারমুখী করে তোলা এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করানো– সব কিছুই ছিল জাসদ ও সমাজতন্ত্রীদের সচেতন সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের ফল।

কিন্তু আশির দশক জুড়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সাধারণ আন্দোলন বা শ্রেণি-পেশার অধিকার প্রতিষ্ঠার বিশেষ আন্দোলন কোনোটাই তার সাফল্যের ছাপ বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনীতি-সংস্কৃতিতে রাখতে পারেনি। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের যে ধারা চালু হয়েছিল, তা-ও আজ বিপন্ন হতে চলেছে।

আশির দশকজুড়ে সমাজতন্ত্রীদের রাজনীতি যতটুকু শক্তিশালী ছিল, এখন কি সেটা আছে? গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিপ্লবী উপাদান থাকা সত্ত্বেও কেন সাধারণ আন্দোলনের ছত্রছায়ায় ’সমাজতান্ত্রিক শক্তিভিত’ গড়ে তোলার কাজ এগুলো না? বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাফল্য কতটুকু? ভবিষ্যৎ আন্দোলন রচনার স্বার্থেই এ সব প্রশ্নের জবাব খোঁজা জরুরি।

দীর্ঘ গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকারী শক্তিসমূহের ‘কেন্দ্রীয় সংস্থা’ তো দূরের ব্যাপার, একমাত্র শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ ছাড়া আন্দোলনের কোনো সংস্থাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি, বরং বিভক্ত হয়েছে। সামরিক শাসনামলে ছাত্রদের প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্যের সংস্থা নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ছিল, শ্রমিক-কর্মচারীদের ঐক্যের সংস্থা নির্বাচিত ট্রেড ইউনিয়ন ছিল, ’৯০এর পর তা-ও নেই। পেশাজীবীদের নির্বাচিত সংস্থাসমূহের মধ্যে শুধু আইনজীবী সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সমিতিগুলো, আইইবি (ইনস্টিউট অব ইঞ্জিনিয়ারস বাংলাদেশ), বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) সমিতিসমূহ ও আরও কয়েকটি হাতেগোনা সমিতি নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে স্ব স্ব পেশার ঐক্যের সংগঠন হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বিএমএ (বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন) ও কেআইবি (কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ) নির্বাচনে এখন আর বিরোধী দলের সমর্থকগণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন না, প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরকার সমর্থকগণ নির্বাচিত হন। গণআন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালনকারী সাংবাদিকদের ইউনিয়ন আজ বিভক্ত।

এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথায় আসি। ১৯৯০এর সফল গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাফল্য অর্জনের জন্য সঠিক কর্মপন্থা নিধারণে জাসদ ও ৫ দল সাফল্য দেখাতে পারেনি। ৫ দলের মাত্র ১ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন (৫ দলভুক্ত জাসদের কেউ নির্বাচিত হতে পারেননি, তবে এরশাদের ‘অনুগত’ বিরোধী দল জাসদের একাংশের নেতা জনাব শাজাহান সিরাজ নির্বাচিত হন), যদিও স্বয়ং এরশাদ ৫টি আসনে জয়লাভ করেন ও তার দল জাতীয় পার্টি তৃতীয় বৃহত্তম সংসদীয় গ্রুপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

অথচ বিজয়ী গণঅভ্যুত্থানের সচেতন রূপকার ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে জাসদ তথা ৫ দলের ক্ষমতাসীন জোটে বা বিরোধী জোটে দাপটের সঙ্গে অবস্থান করাই ছিল যৌক্তিক। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ৫ দলের জোটের সম্প্রসারিত রূপ বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের কেউ নির্বাচিত হতে পারেননি, কিন্তু এরশাদের ‘গঠনমূলক’ বিরোধী জাসদ অপরাংশের নেতা জনাব আ স ম আবদুর রব নির্বাচিত হন, এরশাদের জাতীয় পার্টি তৃতীয় বড় দল হিসেবে তার বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখে।

আর এখানেই জাসদ তথা সমাজতন্ত্রীরা হোঁচট খায়। প্রশ্ন ওঠে জাসদ তথা ৫ দল কেন বিপ্লবী রাজনীতি ও সংগঠন বিকাশে কিংবা সংসদ নির্বাচনে সফল হতে পারল না?

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, তত্ত্ব অনুযায়ী কাজ করা হয়নি, তাই সফলতা আসেনি। বিষয়টা উল্টো করেও দেখা উচিত। বাস্তব ঘটে যাওয়া ঘটনা অনুযায়ী তত্ত্ব পুনর্নির্মাণ করতে হয়, শুধুমাত্র তত্ত্ব দিয়ে বাস্তবের ব্যাখ্যা করতে গেলে তা নতুন ভুলের জন্ম দিতে পারে। অতীতের কর্মসূচী-আন্দোলন-সংগঠনের যা সাফল্য সেটাই বাস্তব। আর যে সব ক্ষেত্রে সফলতা এল না, তার কার্যকারণ ও ঘাটতিগুলো খুঁজে বের করতে হবে।

আন্দোলন-সংগঠন গড়ে তোলা হয় কতগুলো অনুমান বা হাইপোথিসিস নির্মাণ করে। বাস্তবতায় কোনো কোনো অনুমান সফল হয়, কোনোটা আংশিক সফল হয়, আবার কোনোটা সফল হয় না। সফলতা-ব্যর্থতার বাস্তবতা থেকেই নতুন তত্ত্ব নির্মাণ করতে হয়। শরৎচন্দ্রের ভাষায়, ‘মানুষের একদিনের প্রশ্ন তার পরের দিনের উত্তরের সঙ্গে মেলে না।’ নতুন তত্ত্ব নির্মাণ সেখান থেকেই আবার শুরু করতে হবে, পুরনো তত্ত্বের হালনাগাদ করতে হবে।

‘সমন্বয় কমিটির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’এর ধারাবাহিকতায় নতুন তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সময়ের দাবি।