উত্তরায় কিশোরদের ‘গ্যাং’ বা সন্ত্রাসী গ্রুপের খবরটা পড়ার পর থেকে অস্থির লাগছে। এমন সন্ত্রাসী গ্রুপ যে আগে ছিল না তা-ও নয়। কিন্তু আদনান নামে কিশোর ছেলেটির মৃত্যুর পর থেকে এর কুৎসিত রূপটা সামনে চলে এসেছে। আমি যখন কয়েকদিন আগে আদনান কবির নামে একটি কিশোরের মৃত্যুসংবাদ কয়েকটি অনলাইন পত্রিকায় পড়ি তার পর দুটি দিন পুরোপুরি অস্থিরতায় কাটে।

কোনো কাজ করতে পারছি না। কিছু লিখতে পারছি না। বারে বারে চোখে ভেসে উঠছে একটি কিশোরমুখ। খেলতে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরতে পারেনি যে ছেলে। সন্ত্রাসীরা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। যে ছিল হাসিখুশি, একটু রোগা পাতলা গোছের, প্রাণচঞ্চল। সে ছেলের নিথর দেহ পড়ে আছে হাসপাতালের মর্গে!

দৃশ্যটি আমি সহ্য করতে পারছি না। মাত্র অষ্টম বা নবম শ্রেণির একটি ছেলে। খেলার মাঠে দুই গ্রুপের দলাদলির খেসারত দিতে হল তাকে। যারা তাকে মেরেছে তারাও নাকি বয়সে তরুণ। কীভাবে এই তরুণ বয়সের ছেলেরা এত নিষ্ঠুর হল যে, আরেকটি কিশোরকে তারা মেরেই ফেলল? কোন দিকে যাচ্ছে আমাদের সমাজ? কীভাবে এত বেশি নিষ্ঠুরতা দেখা দিচ্ছে তরুণদের মধ্যে?

গুলশানে হলি আর্টিজানের ঘটনায় আমরা এর আগে দেখেছি কী নির্মমভাবে মানুষকে কুপিয়ে, জবাই করে হত্যা করেছে তরুণ পিশাচরা। আদনানকেও কীভাবে পারল এই সন্ত্রাসীরা এভাবে হত্যা করতে? এতটুকু মায়া কি হল না তাদের কারও?

হয়তো গলদ রয়ে গেছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই। গলদ রয়ে যাচ্ছে পারিবারিক পরিবেশের মধ্যেও। তরুণ বয়সীরা এমন কিছু দেখছে বা শিখছে যা তাদের এত বেশি নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে দিচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ রোধ করতে প্রয়োজন আইনের কঠোর শাসন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বড় ধরনের অপরাধ করেও ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে অনেক অপরাধী। একটি অপরাধের যদি যথাযথ বিচার ও অপরাধীর শাস্তি না হয় তখন দশজন নতুন অপরাধীর জন্ম হয়। আজ যদি আদনানের খুনের বিচার না হয়, খুনিরা যদি আইনের ফাঁক গলে প্রভাব খাটিয়ে বেরিয়ে যায় তাহলে আরও অনেক আদনানের মৃত্যুর পথ পরিষ্কার হবে।

বিভিন্ন পত্রিকায় ও অনলাইনে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে উত্তরায় আদনান নামের কিশোরটির মৃত্যুর নেপথ্য কারণ হল দুই গ্রুপের দলাদলি। পাড়ায় মহল্লায় উঠতি কিশোর-তরুণরা গ্যাং বা সন্ত্রাসী গ্রুপ গঠন করছে। পাড়ায় আধিপত্য বিস্তারই এই সব দলাদলির উদ্দেশ্য। এইসব কিশোরদের গ্যাং নাকি নিয়ন্ত্রণ করে ‘বড়ভাই’রা। এই কথিত ‘বড়ভাইরা’ সন্ত্রাসী। কিশোরদের তারাই নিয়ে যায় বিপথে। দেয় নিষ্ঠুরতা, মারামারি ও অপরাধের তালিম। কিশোরদের হাতে অস্ত্র ও মাদক তুলে দেয়।

শুধু তাই নয়, এরা নাকি ফেইসবুকে নানারকম গ্রুপ করছে, ব্যবহার করছে অশালীন ভাষা। চালাচ্ছে হুমকি। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে অপরাধ বিস্তারের নিবিড় যোগাযোগ যে রয়েছে তা সহজ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সজাগ ও তৎপর হত তাহলে কিন্তু এই সব গ্যাং, বড়ভাইদের দাপট কোনো কিছুই থাকত না। প্রাণ দিতে হত না আদনানের মতো কিশোরদের।

এর আগেও এইসব গ্যাং বা বখাটে গ্রুপের তাণ্ডবের খবর প্রকাশিত হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। যতদূর মনে পড়ে মতিঝিল বা টিএন্ডটি কলোনির সামনে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা তরুণীর ওড়না ধরে টান দেয় মটরসাইকেল চালানো বখাটে গ্রুপ। তারপর তাকে সড়কে ফেলে দেয় তারা। তখন মটরসাইকেলের চাকায় ওড়নাটি পেঁচিয়ে যায়। তারপরও মটরসাইকেল না থামিয়ে তারা ওকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় অনেকদূর। পরে সড়কের মধ্যেই মৃত্যু হয় মেয়েটির।

এই ধরনের গ্যাং বা দল শুধু উত্তরা নয়, শহরের অনেক এলাকাতেই গড়ে উঠছে। উঠতি বয়সী বা টিনএজাররা এদেরকে মনে করছে হিরো। কারণ এই গ্যাংএ যারা চলাফেরা করে তারা ইচ্ছেমতো ইভটিজিং করে, মুদির দোকানে বা পাড়ার কনফেকশনারিতে বাকি খায়। বুড়ো বুড়ো মানুষরা এদের দেখলে সালাম দেয়। এদের গার্লফ্রেন্ডদেরও খাতির আলাদা। বিশেষ করে যদি গ্যাংলিডারের গার্লফ্রেন্ড হওয়া যায়। তাহলে মটরসাইকেলে করে ঘোরাঘুরি, যে কোনো রেস্টুরেন্টে খাওয়া, একদল কিশোর তরুণের কাছে ‘সম্মান’ পাওয়া– সবই অনায়াসে জোটে।

এইসব ছেলেদের দেখলেই চেনা যায়। তাদের চুলের স্টাইল অন্যরকম। কখনও স্পাইক করা, কখনও-বা পিছনে ঝুঁটি বাঁধা। হাতে ব্যান্ড, গলায় চেইন। কিন্তু এরা তো ‘বড়ভাইদের’ হাতের পুতুল। তাহলে কারা নিয়ে যাচ্ছে এদের বিপথে, কে সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা?

উত্তরার দুটি গ্রুপের কথাই ধরা যাক। দেখা গেছে সেই দুটি গ্রুপের ছেলেরা বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার থেকে আসা, ভালো স্কুলে পড়া। কিন্তু দুটি গ্রুপেরই নেতা দুজন হল স্বল্পশিক্ষিত এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উপার্জন করা ব্যক্তি। এখন প্রশ্ন হল, কী কারণে, কোন মোহে পড়ে এই মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেগুলো ওই স্বল্পশিক্ষিত সন্ত্রাসী ‘বড়ভাই’এর কথায় ওঠে-বসে?

এটা হল চটজলদি ‘হিরো’ হওয়ার মোহ। ‘বিনাকষ্টে’ প্রতিষ্ঠা, মোটরসাইকেল চালানো, সালাম পাওয়া, গার্লফ্রেন্ডের চোখে হিরো হওয়ার মোহ। যখন একজন কিশোর দেখে সারা বছর পড়ালেখা করে যা রেজাল্ট হচ্ছে তার চেয়ে বড়ভাইদের হুকুম তামিল করে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র পেয়ে বেশি ভালো রেজাল্ট হচ্ছে, তখন আর সে কষ্ট করে সিঁড়ি ভাঙতে চায় না। সে চায় লিফটে উঠতে। এক লহমায় শীর্ষে পৌঁছুতে।

এইসব গ্যাংএর ছেলেদের স্কুলের শিক্ষকরাও কিছু বলতে সাহস পান না। কারণ তাহলে শিক্ষককে পথেঘাটে মেরে ফেলতেও এরা পিছপা হবে না। এইসব গ্যাংএর প্রধান অপকর্ম হল ইভটিজিং ও খেলার মাঠে আধিপত্য। তারপর ধীরে ধীরে ছিনতাই ও মাদকের ব্যবসায় ঢুকে পড়া। ভিকটিম বা পারপিট্রেটর হওয়া। রাজনৈতিক স্বার্থেও এদের ব্যবহার করা হয়।

আদনানের মতো কিশোরদের খুন হওয়া থেকে এবং অন্যদের খুনি হওয়া থেকে বাঁচাতে সবচেয়ে আগে কঠোর ভূমিকায় যেতে হবে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। পাড়ায় মহল্লায় এইসব গ্যাং গ্রুপ মাস্তান ইভটিজার, রাস্তায় জটলা করা, দলবেঁধে অশালীন মন্তব্য করা, মোটরসাইকেলে বেপরোয়া ঘুরে বেড়ানো কিশোর তরুণদের দেখলেই পুলিশের উচিত এদের সতর্ক করা, থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা, বখাটের সাজসজ্জা দেখলে চড়থাপ্পড় মারা এবং অভিভাবকদের ডেকে পাঠানো। গার্লস স্কুল কলেজের সামনে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোকে দুচারবার থানায় নিয়ে ডিটেনশন দিলেই এগুলোর মাথা থেকে ‘হিরো’ হবার খায়েশ পালাবে।

সেই সঙ্গে ‘বড়ভাই’দের গ্রেপ্তার করা দরকার তাদের ‘রাজনৈতিক প্রভাবের’ কথা বিবেচনা না করে। হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার ওই বিষাক্ত বাঁশি ভেঙে ফেলা দরকার অবিলম্বে। রাজনৈতিক দাবাখেলায় ওরা যেন কচুকাটা না হয়।

আর পরিবারেরও কিছু ভূমিকা অবশ্যই রয়েছে। বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখুন আপনার সন্তান কীভাবে বড় হচ্ছে, কার সঙ্গে চলাফেরা করছে। সে কোন আদর্শ নিয়ে বড় হচ্ছে সেটাও খেয়াল করুন। এলাকার ‘বড় ভাই’দের খপ্পরে পড়ার আগেই আপনি তার দিকে মনোযোগ দিন। নিজে যদি তার সামনে ভোগবাদী, নীতিহীন জীবনযাপনের উদাহরণ রাখেন আর মুখে উপদেশ দেন তাহলে কোনো লাভ হবে না। নিজের জীবনে যে মূল্যবোধ মেনে চলেন সেটাই সন্তানকে শিখান।

অনেকে এসব ক্ষেত্রে শুধু মায়ের উদাহরণ টানেন। কিন্তু সন্তানের জন্য বাবা-মা দুজনেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি শিশুর সঙ্গে ছোটবেলা থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেন, সন্তানের বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, সন্তানের সঙ্গে গল্প করেন, তাকে সুস্থ বিনোদনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, তার সামনে সুআদর্শ ও সুউদাহরণ রাখেন তাহলে কিন্তু সে আর বিপথে যায় না।

আমাদের দেশে আগে পাড়ায় মহল্লায় সংস্কৃতিচর্চার সংগঠন ছিল। পরে যে ক্লাবগুলো পরিণত হয় মাদক আর মাস্তানের আখড়ায়। এখন দরকার আবার সেই পাঠাগার, গান শেখা, ছবি আঁকার স্কুল, নাট্যচর্চার মাস্তানমুক্ত ক্লাব, দেয়াল পত্রিকা। ফেইসবুকে বইপ্রেমীদের পেইজগুলোকে প্রোমোট করা দরকার। মানবতাবাদী বাঙালি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ দরকার। দরকার বিশ্বসংস্কৃতিরও সুস্থ দিকের সঙ্গে সন্তানদের পরিচয় ঘটানো।

আর দরকার পারিবারিক আড্ডার। তাহলে তারা জঙ্গি গ্রুপ বা মাস্তান গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ‘বড়ভাই’দের পাশার ঘুঁটিতে পরিণত হবে না। আদনানের মতো আর কোনো কিশোরকে অকালে প্রাণ দিতে হবে না, আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না। কিশোরদের কোমল চেহারা হয়ে উঠবে না খুনি দানবের বীভৎস অবয়ব।