আমেরিকার টুইন-টাওয়ার্সে হামলার ছবিটা এখনও আমাদের চোখে গেঁথে আছে। নাইন-ইলেভেনে টুইন টাওয়ার্সের একটার বুকে গুঁতো মেরেছে প্লেন। সেটায় লেগেছে আগুন। তার পেট থেকে বেরোচ্ছে কালো ধোঁয়া। আকাশচুম্বী ইমারত এখনই ভেঙে পড়বে হুড়মুড়িয়ে। দ্বিতীয় টাওয়ার লক্ষ্য করে ধেয়ে আসছে আর এক বিমান। ছবির দিকে ভালো করে তাকালে দেখা যায় আরও কিছু। কী? কিছু কিছু কালো বিন্দু। যেন দুই টাওয়ার থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে। বিন্দু নয়, ওগুলো মানুষ। যমজ অট্টালিকার সত্তর-আশি তলা থেকে বাইরে ঝাঁপ দিচ্ছে মানুষ; ধ্বংসপিপাসু বিমানের করালগ্রাস থেকে বাঁচতে।

হায়, প্রাণে বাঁচার কী করুণ চেষ্টা! ওই উচ্চতা থেকে লাফ তো মরণঝাঁপই। ওভাবে কি বাঁচা যায়? যায় যে না, সে জ্ঞান লোপ পেয়েছে তখন। লোপ পেয়েছে বিমান-হামলায় মৃত্যুর ভয়ে। জীবন যে কত প্রিয় মানুষের, মরণ যে কত অপ্রিয়, তার সাক্ষ্য ওই ছবি!

না, ভুল বললাম। প্রাণ বাঁচাতে হিতাহিত জ্ঞান লোপ যদি থাকে এক দিকে, তবে অন্য দিকে আছে প্রাণ বিসর্জনের অভিসার। যারা এই বিমান হামলায় অংশ নিয়েছেন কিংবা তার অনুগামীরা, তারাও তো মানুষ। হতে পারে হত্যার নেশায় উন্মত্ত। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরে তাদেরও তো যাবে প্রাণ। শিকার আর শিকারির ভবিতব্য একই। তবু বাসনায় কত তফাত! সবাই যখন বাঁচতে চায়, তখন কেউ কেউ চায় মরতে। জীবন ও মরণের দুই পিপাসা এক ফ্রেমে বন্দি করায় নাইন-ইলেভেনের ওই ছবি এক চূড়ান্ত বৈপরীত্যের নমুনা।

মারো এবং মরো। জঙ্গি বা সন্ত্রাসীর মন্ত্র। জঙ্গি চরিত্রের যে লক্ষণ সবচেয়ে প্রকট, তা হল মৃত্যুলিপ্সা। মরণকে তুচ্ছ— এমনকি অভিপ্রেত— জ্ঞান বোধহয় জঙ্গি মানসিকতার সবচেয়ে বড় উপাদান। এখানে সে সামান্য একজন খুনির থেকে স্বতন্ত্র। প্রায় সব খুনিই ভাবে, অন্তত মনে মনে এ আশা লালন করে যে, বিচারকালে সাক্ষ্যপ্রমাণের ফাঁক গলে সে বেরিয়ে যাবে। রেহাই পাবে চরম শাস্তি থেকে।

জঙ্গির হিসাব-কিতাব ভিন্ন। সে যমের দুয়ারে এক পা দিয়েই রেখেছে। ঢাকায় হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়েছিল যেসব তরুণ বা ফ্রান্সে নিস শহরের সমুদ্রসৈকতে আবালবৃদ্ধবনিতার ওপর দিয়ে ট্রাক চালিয়ে দিয়েছিল যে লোকটি, কিংবা সিলেট-মৌলভীবাজারে যারা বোমা-গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়েছে, তাদের মনে নিশ্চয় নিজেদের প্রাণরক্ষার কোনো তাগিদ ছিল না!

আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাকে জঙ্গিদের আত্মঘাতী হামলা নিয়মিত ঘটনা। আমাদের দেশে আত্মঘাতী হামলার ব্যাপারটা আগে ছিল না। সম্প্রতি আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

১৯৯৯ সালে কবি শামসুর রাহমানের বাসভবনে হামলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার উৎপত্তি ঘটে। এরই ধারবাহিকতায় দেশের ইতিহাসে নৃশংসতা বিবেচনায় সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনাটি ঘটে গুলশানে হলি আর্টিজানে। এরপর থেকেই দেশজুড়ে জঙ্গিবিরোধী হামলা জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচালিত কল্যাণপুর, নারায়ণগঞ্জ, রূপনগর, আজিমপুর, আশকোনা, গাজীপুরের অভিযানে জঙ্গিরা হয় প্রতিরোধ করেছে, নয়তো নিজেরা আত্মঘাতী হয়েছে। আজিমপুর ও আশকোনায় নারী জঙ্গিরাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার চেষ্টা করে। সীতাকুণ্ডের প্রেমতলায় পুলিশের অভিযানের সময় আত্মঘাতী হয় দুই জঙ্গি, যাদের একজন নারী সদস্য। সর্বশেষ সিলেট ও মৌলভীবাজারে পরিচালিত অভিযানেও তারা আত্মঘাতী হয়েছে।

এর শুরুটা হয়েছিল প্রায় ১১ বছর আগে। ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ কুমিল্লায় এক জঙ্গি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানের সময় জেএমবির মোল্লা ওমরের স্ত্রী সাইদা নাঈম সুমাইয়া তার দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে আত্মঘাতী হয়েছিলেন। ১১ বছর পরে জঙ্গিদের আত্মঘাতী হওয়ার ধারাবাহিক প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শুধু তাই নয়, শিশুদেরও এই আত্মঘাতী মৃত্যুতে সহযাত্রী করা হচ্ছে। সর্বশেষ মৌলভীবাজারে যে সাতজনের ছিন্নভিন্ন মরদেহ পাওয়া গেছে তার মধ্যেও চারজনই ছিল শিশু।

স্বামীদের প্ররোচনায় যেমন জঙ্গিবাদে নারীদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে, তেমনি শিশুকে ঢাল বানিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার জঙ্গি আচরণের কারণগুলো খুঁজে বের করা এবং এর প্রতিকারে সামাজিকভাবে মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। তা না হলে বাংলাদেশের পরিণতি হবে আফগান, পাকিস্তান বা সিরিয়ার মতো!

নানাভাবে চাপে থাকা জঙ্গিরা ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা থেকেই মূলত ‘আত্মঘাতী স্কোয়াড’ তৈরি করছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আত্মঘাতী আক্রমণের পেছনে রয়েছে ধর্মের জিগির। ধর্মবিশ্বাস যখন প্রবল হয়, তখন ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে দানা বাঁধে। আর এই ইচ্ছে থেকেই একধরনের শত্রুর অনুসন্ধান করা হয়। এই শত্রুদের হত্যা করাটা তখন জায়েজ মনে করা হয়। জঙ্গিরা মনে করে জিহাদের পথে যদি তারা মৃত্যুবরণ করে তাহলে জান্নাতে চলে যাবে। মূলত এই বিশ্বাস থেকে আমাদের দেশে একশ্রেণির মানুষ জঙ্গিবাদী আদর্শে জড়িয়ে পড়ছে। এটা আমাদের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়।

কারণ যারা স্বেচ্ছায় জীবন দিতে প্রস্তুত, সে যে কারো জীবন নিতেও পারবে। আসরে আত্মঘাতীদের আবির্ভাব ঘটায় জঙ্গিদমনের কাজটা কঠিন হয়ে পড়েছে। হামলার জবাবে গুলি-বারুদের প্রয়োগ জরুরি। কিন্তু যারা মরণোন্মুখ, তাদের কীর্তিকলাপ তো গুলির ভয়ে থামার নয়। ঠিক এ কারণে জঙ্গিবাদ নিয়ে আমাদের আরও গভীর ভাবনা-চিন্তার সময় এসেছে। এই সন্ত্রাসীদের মনের নাগাল পাওয়া দরকার। কোথা থেকে আসছে তাদের এমন মরণ-পিপাসা?

আমেরিকার টুইন-টাওয়ার্সে হামলার পর এ নিয়ে অনেক তত্ত্ব-তালাশ হয়েছে। তখন অনেকেই বলেছেন, জঙ্গিবাদের গোড়ায় থাকে গরিবি আর অশিক্ষা। যেন নিরন্ন এবং অজ্ঞ যুবকদেরই কেবল মগজ ধোলাই করে জঙ্গি বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। যদিও বাস্তবে শুধু তা-ই ঘটছে না। অনেক শিক্ষিত-সম্পন্ন পরিবারের সন্তানরাও জঙ্গি তালিকায় নাম লেখাচ্ছে। আত্মঘাতী হচ্ছে।

আত্মহত্যা ব্যাপারটাই বিজ্ঞানের কাছে এক ধাঁধা। প্রাণীর স্বাভাবিক ধর্ম বংশবিস্তার। আধুনিক ব্যাখ্যায় নিজের জিন ছড়ানো। আত্মহত্যা তো তার উল্টো কাজ। সে কাজে আগ্রহ আসে কোথা থেকে? উত্তর-সন্ধানে ব্যাপৃত যেসব গবেষক, তাদের অগ্রগণ্য আমেরিকায় মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্কট অ্যাট্রান। জিহাদির মন বুঝতে তিনি ছুটে গেছেন ইরাক বা সিরিয়ার সেই সব এলাকায়, যেখানে ধুন্ধুমার লড়াই চলেছে কুর্দিদের সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সমর্থকদের।

খুন করা বা খুন হওয়া যাদের কাছে ‘ডালভাত’, তাদের সঙ্গ পাওয়া খুবই কঠিন। সে ক্ষেত্রে তাঁকে ভরসা করতে হয় যুদ্ধবন্দি আইএস সমর্থক আর মরক্কোর সেই যুবকদের ওপর, যারা জঙ্গি হতে বদ্ধপরিকর। এই দুই শ্রেণির সদস্যদের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা করেছেন অ্যাট্রান।

অ্যাট্রানের সিদ্ধান্ত: জঙ্গিরা একেকজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। সাধারণ মানুষ কোনো কাজে নামার আগে ভাবে তার ‘রিস্ক’ (ঝুঁকি) ও ‘রিওয়ার্ড’ (পুরস্কার) নিয়ে। ‘ডিভোটেড অ্যাক্টর’ বিসর্জন দেয় সে ভাবনা। কেন? অ্যাট্রান লিখেছেন:

“সন্ত্রাসীর কাছে পরিবার, সমাজ– এ সবের কোনো মূল্য নেই। সে জীবনের মানে— তার অস্তিত্বের অর্থ— খুঁজে পায় ‘পবিত্র’ (তার চোখে) আদর্শে নিজেকে সঁপে দিয়ে।”

প্রশ্নোত্তরে অ্যাট্রান জেনেছেন, আইএস সমর্থক যে তরুণরা ‘সুইসাইড বোম্বার’ হতে এক পায়ে খাড়া, তারা সবাই নিজেরা কোরান পড়েনি, কেবল তার ব্যাখ্যা শুনেছে অন্যের মুখে। তারা বর্তমান ধ্বংস করতে চায়, নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়।

কোন ভবিষ্যৎ? যে পৃথিবীতে সর্বত্র চালু হবে শরিয়া আইন। ধর্মভীরু মুসলমান ভিন্ন আর কেউ বাঁচবে না। কারণ মুসলমানরা শ্রেষ্ঠ। অথচ তাদের বঞ্চিত ও পদানত করে রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি আছে আরও এক ফ্যাক্টর– ‘আইডেন্টিটি ফিউশন’। জিহাদি নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে দেহ-মন নিয়ে মিশে যায় গোষ্ঠীর সঙ্গে। ওই একাত্মতা আত্মঘাতী হওয়ার পথে বড় ইন্ধন।

অ্যাট্রানের মতে, পবিত্র আদর্শ আর আইডেন্টিটি ফিউশন– এ দুয়ের মিশ্রণ বড় সাংঘাতিক। এই বিশ্বাস যাদের মধ্যে দৃঢ় হয়, তাদের কাছে প্রাণ নয়, জিহাদটাই আসল। তারা নিজ নিজ আদর্শের জন্য শুধু যে খুন করতে এবং খুন হতে রাজি তা-ই নয়, শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আপন সত্তা মুছে ইতোমধ্যেই গোষ্ঠীতে মিশেও গেছে।

বাংলাদেশে যেসব তরুণ ঘর ছেড়েছে, যেসব নারী-পুরুষ জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে, নিজেরা মরছে, পুলিশকে মারছে, তারা, কে জানে, হয়তো ঘর ছেড়েছে ওই দুই কারণে! তবে কারণগুলো নিয়ে আরও ব্যাপক অনুসন্ধান হওয়া দরকার। রোগের কারণ না জানলে যথাযথ ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে কিভাবে?

পুনশ্চ: মনে রাখা দরকার যে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ানোর সময় ক্রমেই পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সচেতন হতে হবে। সোচ্চার হতে হবে। নিজেদের মধ্যেকার খেয়োখেয়ি বন্ধ করতে হবে। আমাদের দুর্বলতা ওদের শক্তি৷ যত আমাদের সামাজিক বন্ধন দুর্বল হবে, তত ওরা পায়ের নিচে জমি খুঁজে পাবে৷ আমরা কি তা হতে দেব? এর উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। আমাদের দেশকে নিজেদেরই বাসযোগ্য করে তুলতে হবে আমার, আমাদের নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, মৃত্যুর ফেরিওয়ালাদের জন্য নয়।