বাংলাদেশের মানুষের জীবন এখন অনিশ্চয়তার আঁধারে ঢাকা। গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলা এখন বড় অন্যায়। ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে নির্বাচনী নাটকীয়তা এবং প্রহসনের মাধ্যমে। বিনা ভোটের এমপি মন্ত্রীরা মুখে গণতন্ত্রের ফাঁকা বুলি আওড়ায়। আজব এক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাজনীতির তরী আটকে আছে। পল্টন ময়দান, রেসকোর্স মাঠ, শাপলা চত্বর, মানিক মিয়া এভিনিউতে রাজনৈতিক জনসভায় জনতার ঢল এখন তথাকথিত অনুমতির শেকলে বন্দি। রাজনৈতিক নেতারা আমলাদের অনুমতির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণে হতাশ মনে ফিরে আসে বার বার। তারা কি কথা বলবে আর কি করতে পারবে তা নির্ধারণ করে জনগণের কর্মচারীরা। জনগণের মনের কথা বলার জন্য পুলিশের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। হৃদয়ের জানালা তালাবদ্ধ। রাজনীতি করার অবাধ স্বাধীনতার জানালাগুলো খিল আটকে দেয়া। রাজনীতির মুক্ত বিহঙ্গে ডানা ঝাপটানো পাখিরা আজ ডানা ভাঙা পাখির মতো শুধু ওড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। কাকের ডানা ঝাপটানোকে ময়ূর নাচ আখ্যায়িত করে বাক স্বাধীনতার দুয়ারে বাধ্য-বাধকতার দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে। ভোট আর ভাতের শ্লোগানে যারা আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করত তারাই বিরাজনীতিকরণের রাস্তাকে অবারিত করে দিয়েছে। রাজনীতির চিরচেনা গতিপথ পাল্টে গেছে। লগি-বৈঠার তা-বের পর বাংলাদেশ যে খাদের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। এখন সে আর খাদের কিনারে নেই। তাকে গর্তের বহু গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ এখন আকাশ-কুসুম কল্পনা হয়ে গেছে। মঈন-ফকরের দুঃশাসনে যারা খুশি হয়ে বলেছিল এ সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল। তারাই আজ রাষ্ট্রের দ–মু-ের কর্তা। গণতন্ত্রকে বুর্জোয়াদের ক্ষমতার সিঁড়ি বলে যারা গালি দিত, যারা বলতো সংসদ হচ্ছে শুকোরের খোয়াড়Ñ তারাই বিনাভোটে সংসদ সদস্য পদ বাগিয়ে নিয়ে সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে বুর্জোয়তন্ত্রের জাহাজের যাত্রী হয়ে তথাকথিত গণতন্ত্রের বুলি কপচায়।

২০১৪ সালের ভোটারবিহীন ও জনসমর্থনহীন যে সরকার গঠিত হয় তার পুরোটাই বৈধতার প্রশ্নে শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ। ৫ জানুয়ারির ইলেকশন নাটকে ব্যালটের পরিবর্তে বুলেটের মাধ্যমে ক্ষমতার মেয়াদকে আর একদফা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। বিজয়ী ঘোষিত ১৫৩ জন সংসদ সদস্যকে কোনো প্রকার নির্বাচনী কার্যক্রমেই অংশগ্রহণ করতে হয়নি। বাকিরা ভোটকেন্দ্রে ভোটার আনতে না পারলেও কুকুর, বেড়াল দিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। ২০১৮ সালে সেই একই নাটকের অবতারণা করা হয়েছে। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শোনেন যে তার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। কোথাও বেলা দুটোর আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট শুরু আগেই ব্যালট বাক্স ভর্তি ছিল, যার সচিত্র প্রতিবেদন বিবিসি প্রকাশ করেছে। ডেইলি স্টারের একজন প্রতিবেদক একজন বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ রাজধানীর একটি ভোটকেন্দ্রে গেলে সেখানে তারা ভোটকেন্দ্রের গেট বন্ধ পেয়েছে। গেট বন্ধ কেন, এর জবাব দিতে সেখানে দায়িত্বরত কোনো কর্মকর্তা রাজি হননি। এমন আজব নির্বাচনী দৃশ্য গোটা দেশেই বিরাজমান ছিল। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে আসলে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য ছিল বলে মনে হয় না। নাটকের দৃশ্যপটে এবং মঞ্চের ভিন্নতা থাকলেও মূল কাহিনী একই রয়ে গেছে। আজব এ নির্বাচনী সিস্টেমের পর প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপির এ ঘোষণার পর বাম রাজনৈতিক দলসমূহ, বিএনপির রাজনৈতিক জোট বিশদলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও দলীয় সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, আমরা সাধারণ মানুষ কী কোনদিন ভোট দেওয়ার নাগরিক অধিকার ফিরে পাব?

৭ মে ১৯